ইয়েমেনে গত প্রায় দু’মাস ধরে যে তীব্র সংঘাত শুরু হয়েছে, সেই সংঘাতে ইরানের মদতপুষ্ট হুথি গোষ্ঠীর চূড়ান্ত পতন দেখতে চায় দেশটির প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল সরকার। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সেই সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরাহ আল-জৌবা এ তথ্য জানিয়েছেন।
সম্প্রতি লন্ডনভিত্তিক আরবি দৈনিক আশরাখ আল-আওসাতকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়েমেনের চালমান সংঘাত সম্পর্কে আফরাহ আল-জৌবা বলেছেন, “আমরা শান্তিকে পরিত্যাগ করিনি, তবে শান্তির সেই বিভ্রমকে ত্যাগ করেছি যা রাষ্ট্রবিরোধীদের হাতে অস্ত্র রাখার অনুমতি দেয়। বর্তমানে আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের চূড়ান্ত পতন ঘটানো এবং সমগ্র ইয়েমেনে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। রাষ্ট্রের ওপর ইয়েমেনি জনগণের অধিকার কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর মর্জির ওপর নির্ভর করে স্থগিত থাকতে পারে না।”
ইয়েমেনে বর্তমানে সরকারি বাহিনী এবং হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে যে সংঘাত চলছে, তার সূত্রপাত ২০১৪ সালে। সে বছর ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তারপর মাত্র এক বছরের মধ্যে ২০১৫ সালে ইরানের মদতপুষ্ট সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী হুথি রাজধানী সানা দখল করে। হুথিরা রাজধানী দখলের পর ইয়েমেনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদরাব্বুই মনসুর হাদি সৌদিতে পালিয়ে যান। তার নেতৃত্বাধীন সরকারকে ফিরিয়ে এনে ক্ষমতায় বসাতে ওই বছর থেকেই ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করে ইয়েমেন-সৌদি সেনাবাহিনী।
বর্তমানে সানা-সহ ইয়েমেনের পুরো উত্তরাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে ইরানের মদতপুষ্ট হুথি গোষ্ঠী এবং দেশটির দক্ষিণাঞ্চল সৌদি সমর্থিত প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল সরকারের অধীনে আছে।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সৌদি আরবের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করেছিল হুথিরা। তারপর প্রায় চার বছর স্থিতিশীল থাকলেও গত ১৩ জুলাই ইয়েমেনের রাজধানী সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনি বাহিনীর হামলার পর ফের উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে দু’পক্ষের মধ্যে। গত কয়েক সপ্তাহে সেই উত্তেজনা চরম রূপ নিয়েছে এবং চলমান সংঘাতে ইতোমধ্যে হুথিরা ইয়েমেনের ভূখণ্ডে অবস্থিত কৌশলগত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জলপথ বাব এল-মান্দেব প্রণালি দখল করেছে। লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্তকারী ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানির ১২ শতাংশ পরিবহন করা হয়।
আশরাক আল-আসওয়াথকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইয়েমেনের পরররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাব আল-মান্দেবে দেশি-বিদেশি জাহাজের মুক্ত চলাচলের (ফ্রি নেভিগেশন) ব্যাপারটি রাষ্ট্র পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট।
আফরাহ আল-জৌব বলেন, “বাব আল-মান্দেব প্রণালীর নিরাপত্তা (ইয়েমেনের) উপকূল থেকেই শুরু হয়; আর যতক্ষণ পর্যন্ত স্থলভাগতে এইপ্রণালীর জন্য হুমকির উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হবে, ততক্ষণ সমুদ্রে জাহাজ সুরক্ষা নিশ্চিত করার ব্যাপারটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।”
ইয়েমেনে হুথিদের উত্থানের প্রায় শুরু থেকেই প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল সরকারের পাশে আছে সৌদি আরব। সাক্ষাৎকারে আফরাহ আল-জৌবা সৌদি আরবের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার প্রশংসা করেন এবং জোর দিয়ে বলেন, “এই পর্যায়ের সাফল্য ইয়েমেনের কতগুলো শহর পুনরুদ্ধার করা হলো তার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং কতজন নাগরিক তাদের নিরাপত্তা ফিরে পেলেন এবং কতটি পরিবার তাদের বাড়িঘরে ফিরতে পারল—তার ওপর ভিত্তি করেই পরিমাপ করা হবে।”
সূত্র : আরব নিউজ
