আজ বৃহস্পতিবার (আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথি) সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, পূজা-অর্চনা, নামসংকীর্তন ও নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, এদিন ভগবান জগন্নাথ, তাঁর ভ্রাতা বলরাম এবং ভগিনী সুভদ্রা মন্দির থেকে রথে চড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে আসেন। তাই রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি সাম্য, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিক মিলনের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।

হাজার বছরের ঐতিহ্য

রথযাত্রার ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ভারতের ওড়িশার পুরীর জগন্নাথ মন্দিরকে কেন্দ্র করেই এ উৎসবের সূচনা। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মাকে জগন্নাথদেবের মূর্তি নির্মাণের দায়িত্ব দেন। নির্ধারিত সময়ের আগেই দরজা খুলে দেওয়ায় মূর্তিগুলো অসম্পূর্ণ অবস্থায় থেকে যায়। পরে স্বপ্নে জগন্নাথদেব রাজাকে জানান, তিনি এই রূপেই পূজা গ্রহণ করবেন। সেই থেকেই আজও একই রূপে পূজিত হয়ে আসছেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা।

আরেকটি প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, শ্রীকৃষ্ণ মথুরায় যাওয়ার পর বৃন্দাবনের ভক্তদের সঙ্গে পুনর্মিলনের উদ্দেশ্যে বলরাম ও সুভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে রথে চড়ে বৃন্দাবনে যান। সেই স্মৃতিও রথযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

সাম্য ও সম্প্রীতির প্রতীক

রথযাত্রার অন্যতম বার্তা হলো সমাজে সমতা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা। ‘জগন্নাথ’ অর্থ ‘জগতের নাথ’। তাঁর কাছে ধনী-গরিব, জাতি-বর্ণ বা সামাজিক অবস্থানের কোনো ভেদাভেদ নেই। তাই রথের দড়ি টানতে সবাই সমানভাবে অংশগ্রহণ করেন। ভক্তদের বিশ্বাস, আন্তরিক ভক্তিভরে রথের দড়ি টানলে পুণ্য লাভ হয় এবং আত্মিক কল্যাণের পথ সুগম হয়।

ঢাকায় বর্ণাঢ্য আয়োজন

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) বাংলাদেশ এবারও ৯ দিনব্যাপী রথযাত্রা মহোৎসবের আয়োজন করেছে। আজ সকাল ৮টায় রাজধানীর স্বামীবাগ ইসকন মন্দিরে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ ও অগ্নিহোত্র যজ্ঞের মাধ্যমে উৎসবের সূচনা হবে।

বিকেল ৩টায় জগন্নাথদেবের রথ স্বামীবাগ মন্দির থেকে যাত্রা শুরু করে জয়কালী মন্দির, ইত্তেফাক মোড়, শাপলা চত্বর, দৈনিক বাংলার মোড়, পল্টন, জাতীয় প্রেস ক্লাব, হাইকোর্ট, দোয়েল চত্বর, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও পলাশী মোড় হয়ে শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে পৌঁছাবে। আগামী ২৪ জুলাই একই পথে অনুষ্ঠিত হবে উল্টো রথযাত্রা।

ইসকনের তথ্য অনুযায়ী, পুরীর রথযাত্রার পর ঢাকার রথযাত্রাকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রথযাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ বছর দেশের ১২৮টি স্থানে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।

নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা

রথযাত্রাকে ঘিরে সরকার, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে একাধিক সমন্বয় সভা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। পাশাপাশি ইসকনের প্রায় ৫০০ স্বেচ্ছাসেবক সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত থাকবেন।

পুরান ঢাকাতেও ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা

রাজধানীর তাঁতিবাজার শ্রীশ্রী জগন্নাথ জিউ ঠাকুর মন্দির থেকেও আজ বিকেল ৪টায় রথযাত্রা বের হবে। শোভাযাত্রাটি তাঁতিবাজার, বংশাল, নবাবপুর, জনসন রোড, রায়সাহেব বাজার ও লক্ষ্মীবাজারসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করবে।

বিশ্বজুড়ে রথযাত্রার উৎসব

বাংলাদেশ ও ভারতের পাশাপাশি বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও রথযাত্রা উৎসব পালিত হয়। ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের উদ্যোগে ১৯৬৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো শহরে প্রথম আন্তর্জাতিক রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ উৎসব আনন্দ-উৎসাহের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *