ইসরায়েলি-মার্কিন হামলায় ধ্বংস হওয়া ইরানের একটি গোপন সামরিক স্থাপনা ফের দ্রুতগতিতে নির্মাণ করা হচ্ছে। নতুন স্যাটেলাইট ছবির বিশ্লেষণে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। এই স্থাপনাটি ইরানের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দীর্ঘদিন ধরে সন্দেহ করা হয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
গত ১৩ সেপ্টেম্বরের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ইরান শক্তিশালী ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটির ধ্বংসাবশেষের ওপর বড় আকারের একটি ত্রিপল টাঙিয়েছে। এতে ত্রিপলের নিচে চলমান নির্মাণকাজ স্যাটেলাইট ও আকাশপথের নজরদারি থেকে আড়াল করা সম্ভব হচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, সেখানে বুলডোজার, ক্রেন, কংক্রিট মেশিন, ডাম্প ট্রাক ও কংক্রিট পাম্পসহ বিভিন্ন ধরনের নির্মাণযন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।
এই বিশ্লেষণের নেতৃত্ব দিয়েছেন ডেভিড অলব্রাইট। তিনি জাতিসংঘের সাবেক পরমাণু অস্ত্র পরিদর্শক এবং কয়েক দশক ধরে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে তদন্ত করে আসছেন।
ধারণা করা হচ্ছে, একই সঙ্গে ইরান স্থাপনাটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও আরও জোরদার করছে। সেখানে নতুন করে শক্ত কংক্রিটের কাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বিমান হামলা হলে বিস্ফোরণের আঘাত থেকে স্থাপনাটিকে আরও সুরক্ষা দিতে পারে।
এই তথ্য তালেঘান–২-এ ইরানের উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ, স্থাপনাটির সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র-সংক্রান্ত গবেষণার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি বলেছে, ‘যা স্পষ্ট, তা হলো ইরান এই স্থাপনাটি পুনর্নির্মাণের ব্যাপারে এখনও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ প্রতিষ্ঠানটি এই উন্নয়নকে ‘গভীরভাবে উদ্বেগজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছে। কারণ, অতীতে স্থাপনাটি পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে গবেষণায় ব্যবহৃত হয়েছিল।
তালেঘান–২ ইরানের গোপন ‘আমাদ’ কর্মসূচির অংশ ছিল। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা, ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে এই কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করা। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরান ২০০৩ সালে এই কর্মসূচি বন্ধ করে দেয়।
তবে ধারণা করা হয়, তালেঘান ২-এ বিশেষভাবে তৈরি একটি চেম্বার ছিল। সেখানে পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক পরীক্ষা চালানো সম্ভব ছিল। তবে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করার কথা অস্বীকার করে আসছে।
এর আগে, ২০২৪ সালের অক্টোবরে ইরানে ইসরায়েলের বিমান হামলার সময় প্রথমবার তালেঘান-২-এর ভবনটি ধ্বংস করা হয়। এরপর ২০২৫ সালের মে মাসে ইরান ভবনটি পুনর্নির্মাণ শুরু করে। এবার আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করা হয়। এতে শক্তিশালী স্টিলের ফ্রেম, কংক্রিটের আবরণ এবং ওপর থেকে মাটির স্তর ব্যবহার করা হয়েছিল।
ওই পুনর্নির্মাণের সময় স্যাটেলাইট ছবিতে ভবনের ভেতরে একটি বড় নলাকার কাঠামো স্থাপনের চিত্র দেখা যায়। ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির বিশ্লেষকদের ধারণা, এটি উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক ধরে রাখার জন্য তৈরি একটি বিশেষ পাত্র হতে পারে।
চলতি বছরের মার্চে ইসরায়েল আবারও তালেঘান২-এ হামলা চালায়। হামলার পর তোলা উচ্চ রেজল্যুশনের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, বাঙ্কার ধ্বংসকারী অস্ত্রের আঘাতে স্থাপনাটির ওপর তিনটি বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। গর্তগুলো ঠিক সেই অংশের ওপর ছিল, যেখানে সন্দেহভাজন বিস্ফোরক ধারণকারী পাত্রটি রাখা হয়েছিল। ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হামলার নির্ভুলতা দেখে ধারণা করা যায় যে অস্ত্রটি ওই পাত্রটি ধ্বংস করার পাশাপাশি ভবনের ভেতরের কাঠামোও উড়িয়ে দিয়েছে।
এরপর জুন মাসে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাটি পুনরায় মেরামতের কাজ শুরু করে ইরান। শুরুতে হামলায় সৃষ্টি হওয়া গর্তগুলো বন্ধ করা হয়। পরে ওই অংশগুলোর ওপর বসানো হয় শক্তিশালী কংক্রিটের ঢাকনা। সর্বশেষ স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে সেখানে নির্মাণকাজের গতি আরও বেড়েছে।
ভবিষ্যতে বিমান হামলা থেকে স্থাপনাটিকে আরও সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে ভবনের দুই পাশে নতুন করে শক্ত কংক্রিটের মেঝে বা কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখা অংশের নিচেও নির্মাণকাজ অব্যাহত রয়েছে।
তবে পুনর্নির্মাণ করা এই স্থাপনার ভেতরে ইরান শেষ পর্যন্ত কী স্থাপন করতে চায়, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটিও জানিয়েছে, ‘ইরান কেন বারবার এই স্থাপনাটি পুনর্নির্মাণ করছে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি।’
