২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | রাত ৮:৪০:২৮ মিনিট
প্রায় দুই বছর আগে শিক্ষা-উদ্যোক্তা বরিস বাটের মনে হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে উপেক্ষা করার সুযোগ আর নেই। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল একটি ‘আকস্মিক বোধোদয়ের মুহূর্ত’। তিনি বুঝতে পারেন, চীনের অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের মতো তাঁর কোম্পানিকেও এআই প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে একসময় এআইয়ের কারণেই তাদের ব্যবসা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়তে পারে।
 
বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন তাঁর প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকরা, বিশেষ করে বিদেশে সন্তানদের পড়াশোনা করাতে আগ্রহী ধনী অভিভাবকরা, অফিসে এসে বিভিন্ন তথ্য ও পরামর্শ দিতে শুরু করেন। এসব তথ্য তারা কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নয়, এআই চ্যাটবটের মাধ্যমে পেয়েছিলেন।
এরপর বাট নিজস্ব এআইভিত্তিক শিক্ষা সহায়ক ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেন। তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল, এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার বদলে নিজেদের কাজের অংশ করে নেওয়া।
এআই উন্নয়নের গতি ও সক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পরেই চীনের অবস্থান। নতুন নতুন এআই মডেলের সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উন্নত বা ‘ফ্রন্টিয়ার’ এআই মডেলগুলো এখনো চীনের মডেলগুলোর তুলনায় কিছুটা এগিয়ে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে এআইয়ের দ্রুত উন্নয়ন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশেষ করে অত্যন্ত উন্নত এআই ভবিষ্যতে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রযুক্তি খাতের অনেক বিশেষজ্ঞ সতর্ক করছেন। গত শনিবার অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদি ‘ফ্রন্টিয়ার এআই’ উন্নয়নের গতি বিশ্বব্যাপী নিয়ন্ত্রণ বা ধীর করার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।
তবে এই প্রস্তাবে চীনের আগ্রহ নেই বলে মনে করেন প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওমডিয়ার বিশ্লেষক লিয়ান জে সু। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে এআই উন্নয়নের গতি কমিয়ে আনতে চীন মোটেও আগ্রহী নয়।
চীনা সরকারের কাছে এআই জাতীয় সার্বভৌমত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক এআই মডেলের সঙ্গে ব্যবধান কমাতে চীন যে অগ্রগতি করেছে, বেইজিং তা ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চায় না। সু-এর মতে, চীন এ ধরনের আহ্বানকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত আধিপত্য ধরে রাখার কৌশল হিসেবেও দেখতে পারে।
অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী আমোদি বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে বলেন, গণতান্ত্রিক দেশগুলোর এআই সক্ষমতা যেন কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার তুলনায় যতটা সম্ভব এগিয়ে থাকে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। এ কারণে চীনে উন্নত চিপ ও এআই তৈরির প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখার পক্ষেও তিনি মত দেন।
আমোদির বক্তব্যের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ভয় দেখানো, সংঘাত ও বৈরী প্রতিযোগিতা বৈশ্বিক এআই পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে আরও কঠিন করে তুলবে।
তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, এর অর্থ এই নয় যে এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে চীন কোনো উদ্বেগই দেখাচ্ছে না। বরং সাম্প্রতিক নীতিমালায় চীনের অবস্থানে এ ধরনের উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
চলতি সপ্তাহে চীন এআই নিরাপত্তা ও পরিচালনা কাঠামোর তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেছে। বেইজিংভিত্তিক এআই নিরাপত্তা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কনকর্ডিয়ার গবেষক গ্যাব্রিয়েল ওয়াগনারের মতে, নথিটি এআই থেকে তৈরি হতে পারে এমন ঝুঁকি এবং সেগুলো মোকাবিলায় করণীয় বিষয়ে একটি সামগ্রিক কাঠামো তুলে ধরেছে।
নতুন কাঠামোয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে সক্ষম এআই ‘এজেন্ট’-এর ঝুঁকি, অত্যন্ত উন্নত ‘ফ্রন্টিয়ার মডেল’ থেকে তৈরি সাইবার নিরাপত্তা হুমকি এবং ‘রিকাসিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট’ বা এআইয়ের নিজস্ব সক্ষমতা নিজেই বাড়ানোর সম্ভাবনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ওয়াগনারের মতে, আমোদি এবং চীনা সরকারের বক্তব্যের মধ্যে অনেক বেশি মিল রয়েছে। দুই পক্ষই উন্নত এআই থেকে তৈরি সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক, যদিও এআই উন্নয়নের গতি কমানো নিয়ে তাদের অবস্থান এক নয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআইয়ের কারণে মানবজাতি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কাকে ‘হোক্স’ বা ভিত্তিহীন গুজব হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে এআই বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে। তবে দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে বড় কোনো সমঝোতা হবে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
চীন একদিকে এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা তৈরি করছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বিভিন্ন খাতে এই প্রযুক্তির ব্যবহারও উৎসাহিত করছে। দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি প্রযুক্তিটি যেন রাষ্ট্রের নির্ধারিত সীমার মধ্যে বিকশিত হয়, সে বিষয়েও শুরু থেকেই নজর রাখছে।
ওমডিয়ার বিশ্লেষক সু-এর মতে, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকায় এআই থেকে কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি হলে তা মোকাবিলায় চীন কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে।
তবে কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের লিয়া ওয়াং মনে করেন, মার্কিন কোম্পানিগুলোর তুলনায় চীনা কোম্পানিগুলো স্বেচ্ছায় এআই পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের কাজ কম করে। তাঁর মতে, এআইয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোনো দেশের সরকারই এখন পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।
তবে চীনের নীতিমালা তৈরির প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। ওয়াংয়ের মতে, পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে চীন দ্রুত মানিয়ে নেয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন নীতিমালা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
চীনে ২০২২ সাল থেকেই এআই অ্যালগরিদম নিবন্ধনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে কনকর্ডিয়া এআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ‘এজেন্ট’-এর ঝুঁকির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি চীনের নীতিতে একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ এআই কী বলছে, শুধু তা নিয়ন্ত্রণের বদলে এখন এআই কী করছে, সেটিও নিয়ন্ত্রণের দিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া মানুষের মধ্যে ‘কম্প্যানিয়ন এআই’ বা সঙ্গী হিসেবে ব্যবহৃত এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত আবেগীয় নির্ভরতা কমাতেও চলতি বছর জাতীয় পর্যায়ে নীতিমালা করেছে বেইজিং।
অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে চীনের বিভিন্ন শিল্পে এআই ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতেও এআইকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকারগুলো বিভিন্ন কোম্পানিকে অর্থায়ন ও কম ভাড়ায় জায়গা দেওয়ার মতো সুবিধা দিচ্ছে।
এ ধরনের উদ্যোগের সুযোগ পাচ্ছেন উদ্যোক্তা বরিস বাটও। সম্প্রতি সাংহাই থেকে প্রায় তিন ঘণ্টা দূরের একটি ছোট শহরে তাঁর কোম্পানি ‘হ্যাম্পশায়ার এডুকেশন’-এর ধারণা উপস্থাপনের জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার লক্ষ্যে শহরটি বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে।
শুধু শিক্ষা নয়, চীনের বিশাল উৎপাদন খাতের কারখানাগুলোতেও এআই ব্যবহারে জোর দেওয়া হচ্ছে। শিল্প-সেবা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম ব্ল্যাক লেক টেকনোলজিসের এক প্রতিনিধি জানান, প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০ হাজার কারখানার সঙ্গে কাজ করে। তাঁর মতে, এআই ব্যবহারে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও উৎপাদন খাতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো প্রযুক্তিটি কতটা নির্ভরযোগ্য।
চীনের মানুষের দৈনন্দিন জীবন ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর। দেশটিতে তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর মতো এতটা আলোচনা বা উদ্বেগ না থাকায় এআইসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
এর একটি উদাহরণ ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ‘এ-ফু’। এতে বিখ্যাত চিকিৎসকদের এআইভিত্তিক চ্যাটবট সংস্করণ রয়েছে, যেগুলো বাস্তব ক্লিনিক্যাল গবেষণার তথ্য ব্যবহার করে প্রশিক্ষিত। সম্প্রতি এই সেবাটির ব্যবহারকারী ১৫ কোটি ছাড়িয়েছে।
প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘ইয়াংজার ডটকম’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক নি তাও বলেন, অধিকাংশ মানুষ এআইকে কোনো বিমূর্ত হুমকি হিসেবে দেখেন না। বরং তারা এটিকে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় ও কার্যকর একটি প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করছেন। ফলে এআইয়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াকেই তারা বাস্তবসম্মত পথ হিসেবে দেখছেন।
কর্মসংস্থান, ভুল তথ্য ও অপপ্রচারের মতো বিষয় নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও চীনে একই সঙ্গে একটি শক্তিশালী ধারণা তৈরি হয়েছে যে, এআইয়ের গতি কমিয়ে দেওয়ার বদলে এই প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করাই গুরুত্বপূর্ণ।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *