১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | রাত ৬:০৫:৩১ মিনিট

পুলিশের একাংশের পুরোনো ও অচল যানবাহন, পুলিশের অবস্থান নজরদারিতে অপরাধীদের ড্রোনের ব্যবহার এবং মেডিকেল ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের ইয়াবায় আসক্ত করার আশঙ্কাজনক তথ্য— আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন নানা পুরোনো ও নতুন চ্যালেঞ্জের চিত্র উঠে এসেছে জাতীয় সংসদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে। বর্তমানে পুলিশের সাড়ে ৬ হাজারেরও বেশি যানবাহনের বয়স আট বছরের বেশি। অন্যদিকে, অনুমোদিত ৯ হাজার ৭৮৭টি মোটরসাইকেলের মধ্যে সচল রয়েছে মাত্র সাড়ে ৫ হাজারটি।

বৈঠকে মুন্সীগঞ্জের সংসদ সদস্য জানান, সেখানে অপরাধীরা পুলিশের অবস্থান জানতে ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। অন্যদিকে, রাত জেগে পড়াশোনার অজুহাতে মেডিকেল ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের ইয়াবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি)। পাশাপাশি, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে তৈরি হওয়া জনঅসন্তোষ থেকে বিদ্যুৎ কার্যালয়ে হামলার আশঙ্কার কথাও বৈঠকে উঠে আসে। ফলে সীমিত লজিস্টিক সক্ষমতার পুলিশের সামনে প্রচলিত অপরাধের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ, মাদক ও জননিরাপত্তার নতুন নানা ঝুঁকি সামনে এসেছে।

বর্তমানে পুলিশের সাড়ে ৬ হাজারের বেশি যানবাহনের বয়স ৮ বছরের বেশি। অনুমোদিত ৯,৭৮৭টি মোটরসাইকেলের মধ্যে অচল ৪,২৮৪টি এবং থানাগুলোতে ২,৬৫৬টি পিকআপের বড় ঘাটতি রয়েছে। লজিস্টিক ও যানবাহন খাতেই বছরে অতিরিক্ত ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকা প্রয়োজন। নিয়মিত বাজেট দিয়ে এ ক্ষতি পূরণ সম্ভব না হওয়ায় বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পের তাগিদ দেওয়া হয়েছে

সম্প্রতি সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে সদস্যরা বলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের ওপর হামলা, থানায় আক্রমণ ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে মাঠপর্যায়ে বাহিনীর সদস্যদের আত্মবিশ্বাস ও মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পাশাপাশি বিতর্কিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুনর্পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারা। কমিটির পক্ষ থেকে এ ধরনের কর্মকর্তাদের তালিকা যাচাই করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

বৈঠকে পুলিশ বাহিনীর যানবাহন ও অবকাঠামো সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বাহিনীর জন্য জরুরি ভিত্তিতে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, যানবাহন কেনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত থানা ও পুলিশ স্থাপনা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগের কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে অপরাধপ্রবণ এলাকায় বিশেষ চিরুনি অভিযান, মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান এবং মাদক মামলার এজাহার ও জব্দ তালিকা আইনগতভাবে নির্ভুল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কমিটির সদস্য ও ঢাকা-১৬ আসনের এমপি মো. আবদুল বাতেন বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনের পর পুলিশ বাহিনীর মধ্যে এক ধরনের মানসিক ক্ষত তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন অপ্রীতিকর পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি পুলিশের মনোবল ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় বাজেটের বিষয়ে জানতে চান।

জবাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মঞ্জুর মোরশেদ চৌধুরী বলেন, পুলিশের মনোবল বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনে কিছু বাধা তৈরি হলেও দায়িত্বে নিয়োজিত সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জে বালুদস্যু ও অপরাধীরা ড্রোনের মাধ্যমে পুলিশের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে অভিযান ব্যাহত করছে। অন্যদিকে, মেডিকেল ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে রাত জেগে পড়ার অজুহাতে শিক্ষার্থীদের ইয়াবায় আসক্ত করার আশঙ্কাজনক তথ্য পাওয়া গেছে। এসব নতুন ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার, এনটিএমসির এখতিয়ার বৃদ্ধি ও সামাজিক আন্দোলনের কথা বলা হয়েছে

সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানা বলেন, পুলিশ অনেক সময় কঠিন অপরাধীদের গ্রেপ্তার করলেও তারা দ্রুত জামিনে বের হয়ে আসে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় বিতর্কিত ভূমিকা রাখা বা বিভাগীয় শাস্তি পাওয়া কর্মকর্তাদের নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও ঢাকার আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুনরায় পদায়নের পেছনে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানান।

বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। এ অর্থবছরে মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩২ হাজার ৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় ২৮,৬৩৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং উন্নয়ন খাতে ২,৪৬০ কোটি ২১ লাখ টাকা রাখা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী ও কমিটির সদস্য মীর শাহে আলম আনসার-ভিডিপি, এনটিএমসি, পাসপোর্ট ও ভিসা উইংয়ের জন্য পৃথক উন্নয়ন বরাদ্দ আছে কি না এবং দেশের সব জেলায় পাসপোর্ট অফিস রয়েছে কি না, তা জানতে চান। একই সঙ্গে তিনি ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর’-এর নাম পরিবর্তন করে সময়োপযোগী কোনো নাম দেওয়ার প্রস্তাব করেন। কারণ, সংস্থাটি শুধু মাদক নিয়ন্ত্রণই নয়, বিভিন্ন অনুমতি ও লাইসেন্স দেওয়ার কাজও করে।

সিনিয়র সচিব জানান, পুলিশের যানবাহন, থানা ভবন ও স্পিডবোট কেনার জন্য উন্নয়ন বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রয়েছে। গত অর্থবছরে কেনা ২৭২টি নতুন টহল গাড়ি আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে পুলিশ বহরে যুক্ত হবে। এছাড়া নতুন ১০৭টি থানা, পুলিশ ফাঁড়ি ও তদন্তকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ডিপিপি প্রণয়ন করা হয়েছে। পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. নুরুল হাফিজ জানান, দেশের ৬৪ জেলাতেই পাসপোর্ট অফিস রয়েছে। ঢাকায় ছয়টি অফিসের মধ্যে দুটি ভাড়া ভবনে এবং অন্যগুলো নিজস্ব ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের মতো অপরাধপ্রবণ জেলাগুলোতে ঝুলে থাকা ব্যাকলগ মামলা নিষ্পত্তিতে প্রতি ৫ হাজার মামলার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চাঁদাবাজির শিকার ভুক্তভোগীরা ভয়ে অভিযোগ না করলে পুলিশকে বাদী হয়ে মামলা করার সুযোগ দিতে দণ্ডবিধি সংশোধনের প্রস্তাব এবং পুলিশ সদস্যদের শরীরে বডি ক্যামেরা ব্যবহারে আইনি কাঠামো তৈরির কথা জানানো হয়

জাতীয় সংসদের হুইপ ও কমিটির সদস্য মিয়া নুরউদ্দিন আহমেদ অপু যানবাহন ও লজিস্টিক সংকটের কারণে গ্রাম ও থানা পর্যায়ে ব্যাহত হওয়া পুলিশি কার্যক্রম সচল করতে হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান। জবাবে সিনিয়র সচিব জানান, পুলিশের টিঅ্যান্ডই অনুযায়ী মোট যানবাহনের সংখ্যা ১৬ হাজার ২০০। এর মধ্যে ৯,৭৮৭টি মোটরসাইকেলের অনুমোদন থাকলেও সচল রয়েছে ৫,৫০৩টি। ৬,৫৫৮টি যানবাহনের বয়স আট বছরের বেশি। ২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৩,৬৪২টি যানবাহন বাতিল করা হলেও বিপরীতে নতুন কেনা হয়েছে ২,২৪৯টি। ফলে পুলিশের বিপুলসংখ্যক যানবাহন সংকট রয়ে গেছে।

প্রতিটি থানায় ডাবল ও সিঙ্গেল কেবিন মিলিয়ে বর্তমানে ২,৬৫৬টি পিকআপের তীব্র ঘাটতি রয়েছে, যা পূরণে শুধু যানবাহন খাতেই বছরে অতিরিক্ত ৩০০ থেকে ৩ ৫০ কোটি টাকা প্রয়োজন। জুলাইয়ের সহিংসতায় পুলিশের অবকাঠামো ও সরঞ্জামের যে ক্ষতি হয়েছে, তা নিয়মিত বাজেট দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য বিশেষ প্রকল্পের প্রয়োজন বলে জানান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল ইসলাম চরাঞ্চল ও সীমান্তে মাদকের বিস্তারে উদ্বেগ প্রকাশ করে অভিযান জোরদারের দাবি জানান। জবাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে জানান, নতুন আইন অনুযায়ী সংস্থাটির কাঠামো পুনর্গঠন ও অভ্যন্তরীণ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. জিয়াউল হক বলেন, বিপুল মাদক জব্দ হলেও ব্যাপক চাহিদা থাকায় সমস্যাটি নিয়ন্ত্রণে সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন।

মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামান জানান, সেখানে অবৈধ বালু উত্তোলনকারী ও অপরাধীরা ড্রোনের মাধ্যমে পুলিশের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করায় অভিযান ব্যাহত হচ্ছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১২ জনের মৃত্যুর কথাও তুলে ধরে তিনি জেলায় অন্তত দুটি টহল গাড়ি দেওয়ার দাবি জানান।

ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবদুল বাতেন রাজধানীর পল্লবী, রূপনগর ও মোহাম্মদপুরের বিহারি ক্যাম্পগুলোতে মাদক সিন্ডিকেটের বিস্তার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে কাফরুলে আলোচিত জোড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা এবং গণমাধ্যমে ভুল তথ্য সরবরাহের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩২,০৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে উন্নয়ন খাতে রাখা হয়েছে ২,৪৬০ কোটি ২১ লাখ টাকা। পুলিশ বাহিনীতে ইতোমধ্যে ২৭ হাজার কনস্টেবল নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে এবং চলতি বছরেই আরও ১০ হাজার কনস্টেবল ও ২ হাজার এএসআই নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ নিয়োগ হবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে

অন্যদিকে, কমিটির সদস্য মো. নুরুল ইসলাম অপরাধ দমনে সব ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করার ওপর জোর দেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, বিদ্যুৎ লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।

এসব প্রশ্নের জবাবে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির জানান, গোপালগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। টানা পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হতে পারে, যা থেকে বিদ্যুৎ কার্যালয়ে হামলার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ পরিস্থিতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট সব জেলার পুলিশ সুপারদের পল্লী বিদ্যুতের জেনারেল ম্যানেজারদের (জিএম) সঙ্গে সমন্বয় করে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আইজিপি আরও উল্লেখ করেন, তরুণদের মাদকাসক্ত হওয়ার পেছনে বেকারত্ব অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া, মেডিকেল ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে রাত জেগে পড়াশোনার অজুহাতে শিক্ষার্থীদের ইয়াবার মতো মারণ নেশার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। আশঙ্কাজনক এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ওপর নির্ভর না করে নীতিগত ও অনুপ্রেরণামূলক বহুমুখী কর্মসূচি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।

কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদীয় স্থায়ী কমিটি যেকোনো বিষয়ে সুপারিশ এবং বিল বা অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করার একচ্ছত্র এখতিয়ার রাখে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও জোরদার করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নেও অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে অনুমোদিত ও ‘গ্রীন পেজে’ থাকা প্রকল্পের জন্য রক্ষিত প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকার ‘লাম্প’ (এককালীন) বরাদ্দ থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

পুলিশ বাহিনীর জনবল ও নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ইতোমধ্যে বাহিনীতে প্রায় ২৭ হাজার কনস্টেবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং চলতি বছরেই আরও ১০ হাজার কনস্টেবল নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যা বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। এছাড়া, সরাসরি ২ হাজার এএসআই পদে নিয়োগ পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও কারা অধিদপ্তরের সম্পূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা হবে উল্লেখ করে তিনি জানান, শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এসব বাহিনীতে পুরস্কার ও জবাবদিহিমূলক শাস্তির ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে।

বিচার ত্বরান্বিতকরণ ও প্রযুক্তির আধুনিক ব্যবহারে একাধিক পদক্ষেপের কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের মতো সীমান্ত এবং অপরাধপ্রবণ জেলাগুলোতে যেখানে পাঁচ বছরের বেশি সাজা হতে পারে— এমন ঝুলে থাকা মামলার জট অনেক বেশি, সেখানে প্রতি ৫ হাজার মামলার জন্য অন্তত একটি করে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। পাশাপাশি লঘু অপরাধের তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তিতে ‘অন দ্য স্পট’ মোবাইল কোর্টের পরিচালনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হবে। সীমান্ত নিরাপত্তার স্বার্থে বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের টহলে আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি যুক্ত করা এবং সাইবার অপরাধ রুখতে এনটিএমসি-এর আইনি এখতিয়ার বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

চাঁদাবাজি ও আইন সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি জানান, ভুক্তভোগীরা ভয় বা নিরাপত্তাহীনতার কারণে অভিযোগ করতে না চাইলে পুলিশ যাতে নিজে বাদী হয়ে মামলা করতে পারে, সে জন্য দণ্ডবিধি সংশোধন বা নতুন আইন তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের শরীরে বডি ক্যামেরা ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা এবং এর অডিও-ভিডিও রেকর্ডকে আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণের উপযুক্ত আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। অপরাধীদের ক্ষেত্রে নামমাত্র শাস্তির পরিবর্তে কঠোর দণ্ড নিশ্চিত করতে আইন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন তিনি।

সংসদীয় কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, দীর্ঘ সংগ্রাম ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত পতনের পর একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকার ও সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী ও নিপীড়ক শাসনের পর নতুন বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পূর্ণাঙ্গভাবে ফিরিয়ে আনা এবং নাগরিকদের জীবনের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বপ্রধান অগ্রাধিকার।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, সাধারণ মানুষের সুপ্ত গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাশীল থেকে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ মূলমন্ত্রকে হৃদয়ে ধারণ করে দায়িত্ব পালন করতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর পেশাদারত্ব ও জনবান্ধব আচরণই সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করবে, যা একটি সুখী ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

বৈঠকে কমিটির সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধান হুইপ মো. নুরুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, মীর শাহে আলম, রাকিবুল ইসলাম, মিয়া নুরউদ্দিন আহমেদ অপু, মো. কামরুজ্জামান, মো. মনোয়ার হোসেন, শিরীন সুলতানা, মো. নুরুল ইসলাম এবং মো. আবদুল বাতেন। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সিনিয়র সচিব মঞ্জুর মোরশেদ চৌধুরী, আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির, আইসিটি ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আনসার উদ্দিন খান পাঠান, র‌্যাবের মহাপরিচালক মো. আহসান হাবিব পলাশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ, কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. জিয়াউল হক, আনসার-ভিডিপির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, এনটিএমসির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ওসমান সরওয়ার, পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. নুরুল হাফিজ, সংসদ সচিবালয়ের যুগ্ম সচিব নাসিমা খানম, সহকারী পরিচালক তানজিনা তানিন ও কমিটি কর্মকর্তা লতিফা বেগম উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *