স্বাদহীন, গন্ধহীন ও খালি চোখে অদৃশ্য ভারী ধাতু ‘সীসা’ আজ দেশের শিশুদের স্বাভাবিক জীবন, মেধা ও শারীরিক বিকাশ নিঃশব্দে পঙ্গু করে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে— বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে তিন কোটি শিশুর রক্তে ভেসে বেড়াচ্ছে বিষাক্ত এই সীসা, যা এক মারাত্মক ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’র জন্ম দিয়েছে। ঢাকার বাতাসে বিষ ছড়িয়ে দেওয়া অনানুষ্ঠানিক ব্যাটারি কারখানা থেকে শুরু করে থ্রি-হুইলারের অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য এবং দেশে বিশেষায়িত ল্যাব ও চিকিৎসার চরম সংকট— এই পুরো বিষাক্ত চক্রটিকে উদ্ঘাটন করতে ঢাকা পোস্ট-এর তিন পর্বের বিশেষ অনুসন্ধানী সিরিজের আজ থাকছে শেষ পর্ব: সীমিত পরীক্ষার সুযোগ, নেই রেফারেন্স ল্যাব; ভাবনাতেই ‘চিলেশন থেরাপি’।
ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের ১১ বছরের শিশু রেজাউল স্বাভাবিকভাবেই স্কুলে যেত। কিন্তু হঠাৎ তাদের ঘরের পাশেই গড়ে ওঠে একটি অবৈধ ব্যাটারি গলানোর কারখানা। কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া ও ধূলিকণার কারণে কিছুদিন পর থেকেই রেজাউলের শুরু হয় তীব্র মাথাব্যথা ও শ্বাসকষ্ট। ধীরে ধীরে কমে আসে পড়ার আগ্রহ, সঙ্গে যোগ হয় সার্বক্ষণিক বমি বমিভাব।
প্রাথমিক চিকিৎসা ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেও কোনো রোগ ধরা পড়ছিল না। বাধ্য হয়ে স্বজনরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু নিউরোলজি বিভাগে নিয়ে যান। চিকিৎসক ঘটনা শুনে কেসস্টাডি বিশ্লেষণের পর রক্তে সীসার মাত্রা পরীক্ষার জন্য তাকে পাঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেসে (নিনমাস)। সেখানে পরীক্ষায় শিশুটির রক্তে ১৭ দশমিক ৯৭ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ডেসিলিটার (µg/dL) সীসার উপস্থিতি ধরা পড়ে।
বিএমআইসিএস ২০২৫ সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের ৩৮.৩ শতাংশ শিশু ও রাজধানী ঢাকার ৬৫ শতাংশ শিশুর রক্তে বিষাক্ত সীসার উপস্থিতি ধরা পড়েছে। তবে, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর শরীরে সীসার মাত্রা সঠিকভাবে নির্ণয়ের জন্য দেশে নেই কোনো জাতীয় ‘রেফারেন্স ল্যাবরেটরি’। ফলে লক্ষণ দেখা দিলেও কেবল ল্যাব ও সুনির্দিষ্ট ব্লাড স্ক্রিনিংয়ের অভাবে অধিকাংশ শিশু শনাক্তের বাইরেই থেকে যাচ্ছে
বিস্ময় প্রকাশ করে রেজাউলের মা রেহেনা আক্তার বলেন, ‘ও তো কোনো কারখানায় কাজ করে না। স্কুলে আসা-যাওয়া করা ছেলেটার শরীরে কীভাবে সীসা ঢুকল? চঞ্চল, চনমনে ছেলেটা হঠাৎ আনমনে হয়ে পড়ছিল। মাথা ব্যথা আর বমিভাব থাকত সবসময়। অনেক হাসপাতাল ঘুরে জানলাম ছেলেটা সীসার বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, মানবদেহে সীসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। ডব্লিউএইচও নির্ধারিত হস্তক্ষেপের মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম হলেও বিশ্বব্যাপী এটি মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়।
রেজাউলের এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়; বাংলাদেশের লাখ লাখ শিশু প্রতিদিন অজান্তেই মারাত্মক এই বিষের সংস্পর্শে আসছে।
সীসা বিষক্রিয়ায় বাংলাদেশের এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতি উঠে এসেছে ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে’-তে (এমআইসিএস ২০২৫)। এতে দেখা গেছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় চারজনই রক্তে উচ্চমাত্রার সীসা বহন করছে, যা ডব্লিউএইচও নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি।
পরীক্ষায় দেশের ৩৮.৩ শতাংশ শিশু এবং ৭.৫ শতাংশ গর্ভবতী নারীর রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় সীসা পাওয়া গেছে। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, রাজধানী ঢাকার শিশুদের প্রায় ৬৫ শতাংশেরই রক্তে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি সীসা রয়েছে।
এর আগে ২০২০ সালে ইউনিসেফ ও পিওর আর্থের এক যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৫৫ লাখ শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রামের ওপরে।
বাংলাদেশে সীসা বিষক্রিয়া নিয়ে গবেষণা নতুন নয়। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের একটি গবেষণায় ৯১৯ জন শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করে রক্তে সীসার উপস্থিতি ও ঝুঁকির কারণ বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। সমস্যাটি বহু বছর ধরে আলোচনা ও গবেষণায় থাকলেও নিয়মিত জাতীয় স্ক্রিনিং ও চিকিৎসাব্যবস্থা আজ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি।
রক্তে উচ্চমাত্রার সীসা দূর করার একমাত্র বিশ্বস্বীকৃত ব্যবস্থা হলো ‘চিলেশন থেরাপি’। তবে, বাংলাদেশের সরকারি বা বেসরকারি কোনো হাসপাতালেই বর্তমানে এই বিশেষায়িত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় চিলেটিং ওষুধের সুবিধা নেই। ফলে মারাত্মক স্নায়বিক ক্ষতি ও এনসেফালোপ্যাথির ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা আক্রান্ত হওয়ার পরও কোনো কার্যকর চিকিৎসা ছাড়াই স্থায়ী প্রতিবন্ধকতার দিকে ধাবিত হচ্ছে
শনাক্ত ও চিকিৎসার সক্ষমতায় বড় ঘাটতি
পেডিয়াট্রিক নিউরোলজি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্ত বা ঝুঁকিতে থাকা শিশুর সংখ্যা বিশাল হলেও তাদের শনাক্ত ও চিকিৎসা দেওয়ার মতো প্রযুক্তিগত ও চিকিৎসাগত সক্ষমতা দেশে এখনও অপর্যাপ্ত।
সীসা বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখে রোগ নিশ্চিত করা কঠিন। মাথাব্যথা, পেটব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, শিখনফল অর্জনে সমস্যা, অস্বাভাবিক আচরণ কিংবা খিঁচুনির মতো লক্ষণ অন্য অনেক রোগেও দেখা যায়। ফলে নিশ্চিত হওয়ার একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায় হলো রক্তে সীসার মাত্রা পরীক্ষা করা। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নিয়মিত বা দেশব্যাপী রক্তে সীসা পরীক্ষার কোনো পরিকাঠামো গড়ে ওঠেনি। নেই বিশেষায়িত চিকিৎসা পদ্ধতি ‘চিলেশন থেরাপি’র ব্যবস্থাও।
২০২৬ সালের জুনে ইউনিসেফের প্রকাশিত তথ্যে জানানো হয়, বাংলাদেশে মানুষের রক্ত ও পরিবেশগত নমুনা পরীক্ষা করার মতো সক্ষমতাসম্পন্ন কোনো জাতীয় ‘রেফারেন্স ল্যাবরেটরি’ নেই।
সংস্থাটি জানায়, এমন একটি ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা গেলে নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা, শনাক্তকরণ ও জাতীয় পর্যায়ের নজরদারি সম্ভব হতো। কিন্তু অবকাঠামো না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী শিশুদের রক্ত নিয়মিত পরীক্ষা করে নজরদারির আওতায় আনার সুযোগ মারাত্মকভাবে সীমিত।
ইউনিসেফের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. প্রিসিলা ওবিল ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের শিশুদের ট্র্যাকিং করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত রক্ত পরীক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) পেডিয়াট্রিক নিউরোলজি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান এবং সেন্ট্রাল হাসপাতালের কনসালটেন্ট অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত ল্যাবরেটরি গবেষণা বা জাতীয় সমীক্ষা নেই, যা জরুরি ভিত্তিতে করা দরকার। সীসা বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত রোগী যখন আসে, তখন তাদের সঠিক ডায়াগনোসিস করা এবং অভিভাবকদের বোঝানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া, রক্তে সীসার মাত্রা পরীক্ষার সুযোগও অত্যন্ত সীমিত। সীসা দূষণ এখন এক মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সংকট। শুধু ঢাকায় নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও রক্তে সীসার মাত্রা পরীক্ষার ব্যবস্থা দ্রুত সহজলভ্য করা উচিত।’
সীসার বিষক্রিয়া মূলত শিশুদের মস্তিষ্কের পুনর্বাসন ও নিউরোডেভেলপমেন্ট মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। অথচ পুরো বাংলাদেশে ১৮ কোটি মানুষের বিপরীতে পেডিয়াট্রিক নিউরোলজিস্ট রয়েছেন মাত্র ৯৫ জন। এছাড়া, সাধারণ চিকিৎসকদের বড় অংশেরই সীসা বিষক্রিয়ার লক্ষণ ও আধুনিক চিকিৎসা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় রোগীদের সঠিক পরীক্ষা ও পরামর্শ দিতে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা যা বলে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অফিসিয়াল নির্দেশিকা অনুযায়ী, মানবদেহে সীসার কোনো গ্রহণযোগ্য বা নিরাপদ মাত্রা নেই। লক্ষণ অনুযায়ী আক্রান্তের রক্তে সীসার ঘনত্ব (Blood Lead Concentration) পরিমাপের মাধ্যমেই দূষণের তীব্রতা নিশ্চিত করতে হয়।
রক্ত পরীক্ষায় প্রতি ডেসিলিটারে ৫ μg/dL বা তার বেশি সীসা পাওয়া গেলে (যাকে ট্র্রিগার লেভেল বলা হয়) চিকিৎসকের তদারকিতে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। শিশু বা গর্ভবতী মা হলে তাদের দ্রুত দূষণের উৎস চিহ্নিত করে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে প্রথম কাজ।
পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুর আয়রন ও জিংকের ঘাটতি থাকলে তা পূরণ করতে হবে। সীসার উৎস বন্ধ করার পরও যদি রক্তে বিষাক্ত ধাতুর মাত্রা না কমে, কিংবা তীব্র লক্ষণ দেখা দেয়, তবে মুখে খাওয়ার ‘ওরাল চিলেশন থেরাপি’ দেওয়ার বিধান রয়েছে। আর ১০ বছর বা তার কম বয়সী শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা ৪৫ μg/dL বা তার বেশি হলে চিলেশন থেরাপি দেওয়া বাধ্যতামূলক।
কী এই ‘চিলেশন থেরাপি’?
রক্তে সীসার মাত্রা অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেলে কিংবা স্নায়বিক জটিলতা দেখা দিলে চিকিৎসায় চিলেশন থেরাপি প্রয়োগ করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা মতে, রোগীর অবস্থা বুঝে এটি মুখে খাওয়ার ওষুধ কিংবা ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়। চিলেশন থেরাপি এমন একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়া, যা রক্তের বিষাক্ত সীসাকে নিজের সঙ্গে বেঁধে ফেলে এবং পরবর্তীতে প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়।
রক্তে সীসার মাত্রা ৭০ μg/dL বা তার বেশি হলে রোগীকে হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে স্নায়বিক ক্ষতি পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা দিতে হয়।
গুরুতর বিষক্রিয়ায় সাক্সিমার, সোডিয়াম ক্যালসিয়াম এডেটেট কিংবা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ডাইমারক্যাপ্রলের মতো চিলেটিং ওষুধ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। তবে, রক্তে সীসার মাত্রা ৫ μg/dL হলেই চিলেশন থেরাপি দিতে হয় না; বরং মারাত্মক অবস্থায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিবিড় তত্ত্বাবধানে এটি প্রয়োগ করতে হয়।
ওষুধ ও বিশেষজ্ঞের চরম সংকট
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে সীসা বিষক্রিয়া শনাক্তের পরীক্ষার সুযোগ যেমন সীমিত, তেমনি গুরুতর রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় চিলেটিং ওষুধ, পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ও বিশেষায়িত হাসপাতাল ব্যবস্থার চরম ঘাটতি রয়েছে।
সীসার বিষক্রিয়া সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে শিশুর মস্তিষ্কে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে, শিশুদের বিকাশকালে সীসার সংস্পর্শের ফলে স্থায়ী স্নায়বিক ক্ষতি হতে পারে। আর চরম পর্যায়ে ‘এনসেফালোপ্যাথি’ হলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে সিরায় (IV) চিলেশন থেরাপি দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের শিশু মহীনের রক্তে ৭.৯৭ μg/dL সীসা পাওয়া গেলেও দীর্ঘদিন ধরে নানা পরীক্ষা করিয়েও পরিবারটি অসুস্থতার আসল কারণ জানতে পারেনি। অর্থাৎ লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট সীসা পরীক্ষা না করলে রোগটি অদৃশ্যে থেকে যায়।
একইভাবে পিওর আর্থের ‘ওয়ান ইন ৩৬ মিলিয়ন’ কর্মসূচিতে মির্জাপুরের আরেক শিশুর কথা উঠে আসে, যে অনানুষ্ঠানিক ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানার পাশে বাস করায় বিষাক্ত সীসার শিকার হয়ে স্থায়ী মস্তিষ্কের ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই কেস স্টাডিটি প্রমাণ করে, কেবল আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা করলেই চলবে না, বসতবাড়ির আশপাশের মাটি, ধুলা ও ব্যাটারির বর্জ্য পরিষ্কার করা না হলে বিপদ থেকেই যায়।
বাংলাদেশের পেডিয়াট্রিক নিউরোলজিস্টদের মতে, আক্রান্ত শিশুদের মস্তিষ্কের ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটে। এতে স্মৃতিশক্তি হ্রাস, পড়াশোনায় মনোযোগ না থাকা ও আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু এই স্নায়বিক চিকিৎসার জন্য দেশে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ নেই।
বাংলাদেশ চাইল্ড নিউরোলজি সোসাইটি জানিয়েছে, সীসা আক্রান্ত শিশুদের মানসিক ও স্নায়বিক পুনর্বাসন ও নিউরোডেভেলপমেন্ট মনিটরিংয়ের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসকের সংখ্যা দেশের বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় একেবারেই নগণ্য।
চিকিৎসকদের মতামত ও কারিগরি সীমাবদ্ধতা
আইসিডিডিআর,বি-এর এনভায়রনমেন্টাল ইন্টারভেনশনস ইউনিটের প্রকল্প সমন্বয়কারী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এখন সময় এসেছে শুধু সীসায় আক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত করে বসে না থাকার। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের পরিবেশগত পটভূমি জেনে রক্ত পরীক্ষা, পুষ্টি মূল্যায়ন ও সীসার উৎস নিষ্ক্রিয় করতে হবে। মারাত্মক আক্রান্তদের চিলেশন থেরাপির জন্য নিবেদিত রেফারেল হাসপাতাল ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।’
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের শিশু নিউরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এ বি এম মুকিব ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘শিশুরা মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না বা তাদের আইকিউ কমে যাচ্ছে— এর পেছনে অন্তত ১০টি কারণ থাকতে পারে। তবে, সুনির্দিষ্টভাবে সীসার বিষক্রিয়ার কারণেই এটি হচ্ছে কি না, তা রক্ত পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সীসাদূষণ ও এর বিষক্রিয়া সম্পর্কে সরকার অবগত থাকলেও মাঠপর্যায়ে এটি কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বুদ্ধিমত্তা হ্রাস পাওয়া, অটিজম, মনোযোগ দিতে না পারা কিংবা যোগাযোগে অক্ষমতার মতো লক্ষণ নিয়ে রোগীরা মূলত আমাদের মতো নিউরোলজি বিশেষজ্ঞদের কাছেই আসে। বর্তমানে দেশে প্রায় ২,৪০০ জন শিশু চিকিৎসক থাকলেও পেডিয়াট্রিক নিউরোলজিস্টের সংখ্যা মাত্র ৯৫ জন, যার মধ্যে মাত্র ২০ জনের মতো সিনিয়র। সবমিলিয়ে হাতে গোনা এই শতাধিক বিশেষজ্ঞই শিশুদের মেধা ও বুদ্ধি কমে যাওয়ার পেছনের কারণগুলো নিয়ে ভাবছেন। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো আমাদের সচেতন হতে সাহায্য করছে। তবে, দেশে রক্তে সীসার মাত্রা পরীক্ষার (ব্লাড স্ক্রিনিং) সুযোগ এখনও অত্যন্ত সীমিত। সরকারি উদ্যোগে এই সুবিধা অবিলম্বে বাড়ানো ও সহজলভ্য করা উচিত।’
অন্যদিকে, আইসিডিডিআর,বি-র এনভায়রনমেন্টাল ইন্টারভেনশনস ইউনিটের প্রকল্প সমন্বয়কারী ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘চিকিৎসা ক্ষেত্রে কেবল প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাই নয়, চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতার ঘাটতিও বড় একটি চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে মাত্র ২২০০ চাইল্ড নিউরোলজিস্ট আছেন। তাদের মধ্যে আবার ১৫০০ থেকে ১৮০০ চিকিৎসকের সীসা বিষক্রিয়ার লক্ষণ ও এর আধুনিক চিকিৎসা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই। চিকিৎসকরা নিজেরা সচেতন না হলে রোগীদের ব্লাড স্ক্রিনিংয়ের পরামর্শ দেবেন কীভাবে? চিকিৎসক সুপারিশ করলেই কেবল রোগীরা পরীক্ষা করাতে উৎসুক হবেন।’
তিনি আরও যুক্ত করেন, ‘কোথায়, কীভাবে সীসা গলানো হচ্ছে বা কীভাবে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, তা জানাও গুরুত্বপূর্ণ। ব্লাড স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে আক্রান্ত শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা ধরা পড়ে, তবে বিভিন্ন গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে— ব্যাটারি গলানোর কেন্দ্রগুলো থেকেই মূলত এই সীসা ছড়াচ্ছে।’
চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, “আক্রান্ত শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত, যা মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে রয়েছে। এই পরীক্ষার পরিধি দ্রুত বাড়ানো দরকার। এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি একটি জাতীয় ‘রেফারেন্স ল্যাবরেটরি’ প্রতিষ্ঠা করা, যেন মানুষের রক্ত ও পরিবেশগত নমুনা একই জাতীয় নজরদারি কাঠামোর আওতায় এনে পরীক্ষা করা যায়। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালগুলোতে ঝুঁকিভিত্তিক ব্লাড স্ক্রিনিং, কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার (ডেটাবেজ), শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ পর্যবেক্ষণ এবং গুরুতর রোগীদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলা প্রয়োজন।”
সরকারি উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, সংকট নিরসনে সরকারের উদ্যোগ একেবারেই থমকে নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সহযোগী সংস্থাগুলোর সহায়তায় সীসা বিষক্রিয়া ব্যবস্থাপনায় ‘জাতীয় ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন’ ও প্রশিক্ষণ উপকরণ তৈরি করা হয়েছে। ইউনিসেফের কারিগরি সহায়তায় মাস্টার ট্রেইনার তৈরি করে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৪৮ জন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী এবং ৫৩৮ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি বিস্তৃত জাতীয় কৌশল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পিওর আর্থের সহায়তায় ‘সীসামুক্ত বাংলাদেশ: জাতীয় কৌশল ও বহু-বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা ২০২৬–২০৩৫’ প্রস্তুত করা হয়েছে, যা মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেয়েছে। এই পরিকল্পনার আওতায় স্বাস্থ্য, পরিবেশ, শিল্প ও ভোক্তাসুরক্ষা খাতকে একসুতোয় বেঁধে কাজ করার কথা বলা হয়েছে।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে গঠন করা হয়েছে আন্তঃমন্ত্রণালয় স্টিয়ারিং কমিটি। খাদ্যদ্রব্য, খেলনা ও বাজারের সামগ্রী পরীক্ষার পাশাপাশি বাড়িভিত্তিক মূল্যায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে শিশুদের রক্তে সীসা প্রবেশের সঠিক উৎস বন্ধ করা যায়।
পিওর আর্থ বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মিতালী দাশ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য রক্ষায় পরিবেশগত আইনের কঠোর প্রয়োগ, চিকিৎসা নজরদারি এবং সর্বস্তরে সচেতনতা তৈরি ছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ করা সম্ভব নয়।’
ব্যাপক রূপান্তর ছাড়া লক্ষ্য অর্জন কঠিন: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে পুরোপুরি সীসামুক্ত করার লক্ষ্যকে ‘অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং’ বলে মনে করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সর্দার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল।
ঢাকা পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘২০৩৫ সালের মধ্যে দেশ সীসামুক্ত করতে হলে শিল্প, পরিবহন ও পরিবেশ খাতে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন ও ব্যাপক রূপান্তর আনতে হবে। সীসা দূষণের কারণে শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি থমকে যাচ্ছে, হজমশক্তি নষ্ট হচ্ছে এবং অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা বাড়ছে। এমনকি নিউমোনিয়া বা হামে আক্রান্ত শিশুদের শারীরিক অবনতির পেছনেও সীসার পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে।’
দেশে সীসা আক্রান্তদের সুনির্দিষ্ট চিকিৎসার ঘাটতির কথা স্বীকার করে মন্ত্রী বলেন, “জাতীয়ভাবে রক্তে সীসার মাত্রা পরীক্ষার (ব্লাড স্ক্রিনিং) কোনো ব্যবস্থা বা কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ এখনও গড়ে ওঠেনি। তবে, সেটি তৈরির চেষ্টা চলছে। এছাড়া, সীসা বিষক্রিয়ার বিশেষায়িত চিকিৎসা ‘চিলেশন থেরাপি’র সুবিধাও আপাতত দেশে চালু নেই।”
তবে, এই দুটি বিষয়কে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আশ্বস্ত করেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা সেরেছি। ব্লাড স্ক্রিনিং ও চিলেশন থেরাপি চালুর বিষয়ে চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়ে শিগগিরই একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’
