প্রায় তিন বছর ধরে অপেক্ষার পর অবশেষে স্বজনদের শেষ বিদায় জানাল গাজার দুটি পরিবার। ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংস হওয়া গাজার এক মন্ত্রীর বাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা ১১২ জনের মৃতদেহ দাফনে মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) গাজা সিটির সাবরা এলাকায় জড়ো হন হাজারো মানুষ।

আল জাজিরার খবরে বলা হয়, ২০২৩ সালে গাজায় ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর এটি সবচেয়ে বড় গণদাফনগুলোর একটি বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলো আবু শুরাইয়া ও আল-হাসাইনা পরিবারের সদস্যদের। তাদের পরিবারের সদস্যরা প্রায় তিন বছর ধরে ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ ছিলেন।

 

স্বজনদের মধ্যে ছিলেন ৩৯ বছর বয়সী লারার মা নাওয়াল, তার আট ভাই-বোন এবং বেশ কয়েকজন ভাতিজা-ভাতিজি। ২০২৩ সালের ২২ নভেম্বর সাবরা এলাকায় পরিবারের বসতিতে ইসরায়েলি হামলায় তারা নিহত হন।

 

হামলার সময় লারা তার স্বামী ও পাঁচ সন্তানকে নিয়ে দক্ষিণ গাজায় বাস্তুচ্যুত ছিলেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা সাবরায় থেকে গিয়েছিলেন। হামলার খবর পাওয়ার পর বোনকে বারবার ফোন করেও কোনো সাড়া পাননি তিনি। পরে জানতে পারেন, পরিবারের সদস্যরা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছেন।

 

সংবাদ প্রতিবেদন

উদ্ধারকৃত দেহাবশেষ ভর্তি সাদা ব্যাগগুলো যখন দাফনের স্থানে এসে পৌঁছায়, তখন লারা অন্যান্য শোকাহত আত্মীয়দের মাঝে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমার পরিবার এক মুহূর্তের মধ্যেই যেন হারিয়ে গেল। আজকের দিনটা ঠিক সেই দিনের মতো মনে হচ্ছিল, যেদিন আমি প্রথম তাদের হারিয়েছিলাম। এভাবে তাদের বিদায় জানানোটা ছিল এক নতুন শোক।’

 

দীর্ঘদিন তিনি বিশ্বাস করতে পারেননি যে তার স্বজনেরা আর বেঁচে নেই। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণ গাজা থেকে ফিরে তিনি ধ্বংসস্তূপের কাছে যান। সেখানে কোনো জীবিত মানুষকে খুঁজে না পেলেও তার মনে আশা ছিল, হয়তো পরিবারের কেউ কোথাও বেঁচে আছেন।

 

দাফনের কয়েক সপ্তাহ আগে গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী ধ্বংস হওয়া বাড়িগুলো থেকে মরদেহ উদ্ধারের অভিযান শুরু করে। নিখোঁজ থাকা ১৫৩ জনের মধ্যে মোট ১১২ জনের দেহাবশেষ পাওয়া গেছে।

 

গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো ৮ হাজারের বেশি মরদেহ পড়ে থাকতে পারে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও উদ্ধার সক্ষমতার অভাবে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

তিনি বলেন, ‘অনেক মরদেহ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে শনাক্ত করাও কঠিন। কোথাও মরদেহের অংশ ছড়িয়ে পড়েছে, আবার কোথাও ধ্বংসস্তূপের সঙ্গে মিশে গেছে। ফিলিস্তিনি আন্দোলনের ইতিহাসে এই প্রথমবার, এক জানাজায় ১১২ জন শহিদকে দাফন করা হচ্ছে।’

 

লারার কাছে স্বজনদের মরদেহের সন্ধান পাওয়া ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘আমি দেখতে চাই। একটা হাড় হলেও দেখতে চাই। তাদের কিছু একটা দেখতে চাই।’

 

দাফনের সময় সাদা ব্যাগে করে উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষ নিয়ে যাওয়া হয়। আশপাশের ভবনের বারান্দা থেকে নারীরা কান্নার মধ্যে ফুল ছিটিয়ে স্বজনদের বিদায় জানান। তিন বছর পর শেষ পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের দাফন হলেও লারার কাছে এতে শোকের সমাপ্তি আসেনি।

 

লারার ৫০ বছর বয়সী আত্মীয় আলি আবু শুরাইয়াও দক্ষিণ গাজায় বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন যখন তাদের পরিবারের আশ্রয়স্থলে হামলা চালানো হয়। তিনি স্মরণ করে বলেন, ‘খবর আসতে শুরু করল একটা বাড়িতে হামলা, তারপর আরেকটা, তারপর আরেকটা। আমি আমার দুই ভাই এবং তাদের পুরো পরিবার—স্ত্রী ও সন্তানদের হারিয়েছি।’

 

আলি জানান, তাকে জানানো হয়েছিল যে আবু শুরাইয়া এবং আল-হাসাইনা পরিবারের বাড়িতে হামলাটি দুই ঘণ্টারও কম সময়ে ঘটেছিল। তার তথ্য অনুযায়ী, বাড়ির ভেতরের মানুষজন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরে যেতে থাকে এবং অবশেষে ফিলিস্তিনের সাবেক গণপূর্ত ও আবাসন মন্ত্রী মুফিদ আল-হাসাইনার বাড়িতে আশ্রয় নেয়।

 

আলি বলেন, ‘তারা ভেবেছিল তারা নিরাপদ থাকবে, কিন্তু যুদ্ধযন্ত্র বেসামরিক নাগরিক, বাড়িঘর বা পরিবারের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেনি। সাতটি পরিবারকে নাগরিক নিবন্ধন থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলা হয়েছিল।’

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *