
বি কার্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের খাবারের ছবি তোলা ও তা গণমাধ্যমে প্রকাশের সিদ্ধান্ত তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশেই নেয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ। এ সংক্রান্ত একটি অডিও কলের কথোপকথনের প্রতিলিপি বুধবার (১২ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে ওবায়দুল কাদের ও অন্য ছয়জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার যুক্তিতর্কের উপস্থাপনের দিনে কল রেকর্ডটি প্রমাণ হিসেবে জমা দেয় প্রসিকিউশন।
ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত ওবায়দুল কাদের ও হারুন অর রশীদের কথোপকথনের প্রতিলিপিতে হারুনকে বলতে শোনা যায়, সমন্বয়কদের খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত তার নিজের ছিল না। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও এসবি প্রধানের নির্দেশেই খাবারের ব্যবস্থা করা এবং ছবি তোলা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
কথোপকথনে ওবায়দুল কাদের প্রশ্ন করেন, খাওয়ানোর পর ছবি তুলে বাইরে প্রকাশ করতে বলা হয়েছিল কি না। জবাবে হারুন বলেন, ছবি তোলা এবং সংবাদে প্রকাশের জন্য তা পাঠানোর নির্দেশও দেয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে তৎকালীন এসবি প্রধান মনিরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলার কথাও বলেন তিনি।
হারুন আরও বলেন, তিনি যা করেছেন তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির নির্দেশেই করেছেন। এর বাইরে তিনি একবিন্দুও কিছু করেননি। এ বিষয়ে প্রমাণ নেয়ার জন্যও ওবায়দুল কাদেরকে অনুরোধ করেন তিনি।
কথোপকথনের একপর্যায়ে হারুন অভিযোগ করেন, এ ঘটনায় তাকে ডিবি থেকে সরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তিনি ওবায়দুল কাদেরের কাছে জানতে চান, তার অপরাধ কী।
এদিকে, ওবায়দুল কাদের ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের আরেকটি অডিও কলের প্রতিলিপিও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে হারুনকে সরিয়ে দেয়া নিয়ে দুজনের মধ্যে আলোচনা হয়।
আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, হারুনকে ডিএমপির মধ্যেই রাখা হবে, তবে তার দায়িত্ব পরিবর্তন করা হবে। তিনি জানান, হারুনকে অন্য কোথাও দেয়ার কথা থাকলেও ডিএমপিতেই রেখে শুধু ডিবির দায়িত্ব থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল।
ওবায়দুল কাদের এ সিদ্ধান্তে পুলিশের মধ্যে প্রতিক্রিয়া ও বাহিনীর মনোবল ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কার কথা বলেন। জবাবে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও পুলিশের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা স্বীকার করেন।
কথোপকথনে আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী হারুনকে সরিয়ে দেয়ার বিষয়ে নির্দেশ দেয়ার পর তিনি তার দায়িত্ব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাকে সাত দিন ধরে বিষয়টি করতে বলা হচ্ছিল বলেও জানান তিনি।
ওবায়দুল কাদের তখন বিষয়টি পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেন এবং প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি জানাতে বলেন। আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জানান, তিনি ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরই হারুনের দায়িত্ব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়াও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান আসামি।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, মামলার সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২।
পরে গত ২ আগস্ট মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ হয়। তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৮ জন সাক্ষী এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন। বর্তমানে মামলাটির যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলছে।
