বিদেশে উচ্চশিক্ষা, স্কুলিং ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটের প্রলোভন দেখিয়ে শত শত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে রাজধানীর ভিসা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জাস্ট থট এডুকেশন-এর বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের দাবি, ভুয়া অফার লেটার, নিশ্চিত ভিসার আশ্বাস এবং একের পর এক নতুন খরচের কথা বলে তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়া হলেও অধিকাংশই পাননি ভিসা কিংবা টাকা ফেরত।
সন্তানদের কানাডা পাঠাতে গিয়ে হারালেন ২৬ লাখ টাকা
ফেনীর বাসিন্দা নূর নাদিয়া জানান, গত বছরের ডিসেম্বরে দুই সন্তানকে স্কুলিং ভিসায় কানাডায় পাঠানোর উদ্দেশ্যে তিনি জাস্ট থট এডুকেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রতিষ্ঠানের কাউন্সেলরদের আশ্বাসে বিশ্বাস করে সন্তানদের ও নিজের অফার লেটার পাওয়ার পর তিনি প্রায় ২৬ লাখ টাকা ব্যাংক ও নগদে পরিশোধ করেন।
তবে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও ভিসা না পাওয়ায় তিনি অফার লেটার যাচাই করে জানতে পারেন সেটি ভুয়া ছিল।
তার ভাষায়, “তারা এমনভাবে আশ্বাস দিত যে সন্দেহ করার সুযোগই ছিল না। এমনকি আমার সন্তানদের স্থানীয় স্কুলেও ভর্তি না করতে বলেছিল, কারণ তারা নিশ্চিত করেছিল খুব দ্রুত কানাডার ভিসা হয়ে যাবে।”
মাল্টার ভিসার আশায় ১৩ লাখ টাকা খুইয়েছেন দুই বন্ধু
নারায়ণগঞ্জের তাহমিনা আক্তার জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখে তিনি ও তার এক বান্ধবী মাল্টার ভিসার জন্য আবেদন করেন। অফার লেটার পাওয়ার পর টিউশন ফি ও ভিসা প্রসেসিংয়ের নামে তারা ১৩ লাখ টাকা পরিশোধ করেন।
কিন্তু পরবর্তীতে ভিসা তো পানইনি, বরং টাকা ফেরতের জন্য দেওয়া চেকও ব্যাংকে গিয়ে অকার্যকর বলে জানতে পারেন।
ঋণের বোঝায় বিপর্যস্ত পরিবার
সুনামগঞ্জের আরিফুল ইসলাম বলেন, কানাডায় যাওয়ার স্বপ্নে তিনি ৮ লাখ টাকা পরিশোধ করেছিলেন। সেই টাকা জোগাড় করতে আত্মীয়দের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি পারিবারিক জমিও বিক্রি করতে হয়েছে। কিন্তু ভিসা না পেয়ে এখন ঋণের চাপে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
শত শত ভুক্তভোগী, কোটি টাকার অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, বিদেশে উচ্চশিক্ষা, স্কুলিং ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটের নামে অন্তত ৬০০-এর বেশি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের কাছ থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার হারুন অর রশিদ ওরফে মতিউর রহমান আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, ভুয়া অফার লেটার এবং নিশ্চিত ভিসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই অর্থ সংগ্রহ করেন।
একের পর এক অজুহাতে নেওয়া হতো টাকা
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক নিবন্ধনের পর বিভিন্ন ধাপে নতুন নতুন খরচ দেখিয়ে টাকা আদায় করা হতো। যেমন—
- অফার লেটার ফি
- টিউশন ফি
- ভিসা প্রসেসিং
- বায়োমেট্রিক
- মেডিকেল
- জিএসআইসি
- বীমা
- দূতাবাস-সংক্রান্ত ফি
শুরুতে তুলনামূলক কম টাকা নিলেও পরে সেই অঙ্ক কয়েক লাখ থেকে ২০–৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যেত বলে অভিযোগ।
অফিস বন্ধ করে আত্মগোপন
ভুক্তভোগীদের দাবি, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, মাল্টা, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও ফিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে ভর্তি ও ভিসা প্রক্রিয়ার নামে বিপুল অর্থ সংগ্রহের পর গত ৩ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির বাড্ডা, গুলশান ও বনানীসহ রাজধানীর সব অফিস বন্ধ করে সংশ্লিষ্টরা আত্মগোপনে চলে যান।
গ্রেপ্তার চারজন, আদালতে উত্তেজনা
প্রতারণার মাধ্যমে ৯১ জন শিক্ষার্থীর ৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার পর গত সোমবার রাজধানীর উত্তরা থেকে প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার মতিউর রহমানকে আটক করে পুলিশ। পরে আরও তিন কর্মকর্তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
আদালত চার আসামির রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। তাদের মধ্যে তানজির ইসলামের চার দিনের এবং অন্য তিন আসামির পাঁচ দিনের রিমান্ড অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ
আসামিদের আদালতে হাজির করা হলে শতাধিক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করেন এবং তাদের ওপর হামলার চেষ্টা চালান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ দ্রুত নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে আসামিদের আদালত প্রাঙ্গণ থেকে সরিয়ে নেয়।
ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মহিউদ্দিন মাহমুদ সোহেল জানান, পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় আসামিদের নিরাপদে হাজতখানায় নেওয়া সম্ভব হয়েছে।
তদন্ত অব্যাহত
পুলিশ জানিয়েছে, প্রতারণার পুরো নেটওয়ার্ক, অর্থ আত্মসাতের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, অভিযোগগুলোর তদন্ত এখনো চলমান। তাই আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আইনগতভাবে প্রমাণিত বলে গণ্য করা হবে না।
