স্টাফ রিপোর্টার

যশোরের নওয়াপাড়ায় ভৈরব নদে গোসল করতে নেমে নিখোঁজ ফাতেমা আক্তার বর্ণা (২৮) নামের সেই গৃহবধূর ২৭ ঘণ্টায়ও সন্ধান মেলেনি। নৌ পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও ডুবুরিরা অনেক খোঁজাখুঁজির পরও শনিবার (১৮ জুলাই) বিকাল ৪টা পর্যন্ত তাকে উদ্ধার করতে পারেনি।

এদিকে, বর্ণার সন্ধানে স্বজনরা ভৈরব নদের পাড়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। নদীর তীরে স্বজনদের অপেক্ষা আর কান্না যেন থামছেই না। তাদের মধ্যে চলছে আর্তনাদ। এর আগে শুক্রবার দুপুর ১টার দিকে নওয়াপাড়ার সরদার মিলসংলগ্ন মালোপাড়া মহিলা ঘাটে গোসলে নেমে নিখোঁজ হন বর্ণা। তিনি অভয়নগর উপজেলার মশরহাটি গ্রামের হাবিবুর রহমানের মেয়ে ও ঢাকার মিরপুরের রবিউল আলম খানের স্ত্রী। বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসে ভাই বান্ধবী ও স্বজদের সঙ্গে গোসলে নেমে নিখোঁজ হন।

 

নওয়াপাড়া নৌ পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রনজিত কুমার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভৈরব নদের যে জায়গাটিতে বর্ণা গোসলের জন্য লাফ দিয়েছেন, সে জায়গাটি অনেক গভীর। ভাটা থাকলে অল্প পানি থাকে, আর জোয়ার থাকলে ২৫-৩০ ফুট গভীর। লাফ দেওয়ার সময় নদীতে স্রোত ও জোয়ার ছিল। আমরা দ্বিতীয় দিনের মতো তল্লাশি করছি। সম্ভব্য জায়গায় থাকা কার্গো জাহাজগুলো সরিয়েও তল্লাশি করছি। নদীর স্রোতমুখী দুই পাশেই তল্লাশি চলছে। অন্তত দুই থেকে তিন কিলোমিটার তল্লাশি করেছি। তারপরও হাল ছাড়ছি না। ধারণা করছি স্রোতে অনেক দূরে নিয়ে গেছে। নদীতে প্রবল স্রোতে উদ্ধার কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। উদ্ধার করতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি। উদ্ধার অভিযান কতক্ষণ পর্যন্ত চলবে, তা বলা যাচ্ছে না।’

 

শনিবার বিকালে নওয়াপাড়ার সরদার মিলসংলগ্ন মালোপাড়া ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, বর্ণার পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসীর ভিড়। সবার চোখেমুখে উৎকণ্ঠা। কেউ কেউ হাউমাউ করে কাঁদছেন। কেউ কেউ নীরবে কেঁদে রুমালে অশ্রু মুছছেন। শোক, দুঃখ ও কান্নায় ওই এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। বর্ণার ছোট ভাই ও বাবা নদীর পাড়ে বসে কাঁদছেন। একটু দূরেই বর্ণার স্বামী রবিউল আলম দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনিও নদীর দিকে চেয়ে নীরবে কেঁদে চলেছেন।

স্থানীয় লোকজন জানান, বর্ণার মা বেঁচে নেই। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিলেন বর্ণা। চার বছর আগে পারিবারিকভাবে ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা রবিউল আলম খানের সঙ্গে বিয়ে হয়। স্বামী চাকরির সুবাদে তারা মানিকগঞ্জে বসাবস করতেন। এই দম্পতির এখনও সন্তান হয়নি। চলতি মাসের ৯ তারিখে বর্ণা বাবার বাড়িতে আসেন। বাড়িতে এসে প্রতিদিনই নওয়াপাড়ার এই ঘাটে স্বজনদের সঙ্গে গোসল করতে আসেন। গোসল শেষে বাড়িতেও চলে যান। কিন্তু শুক্রবার গোসলে এসে আর বাড়িতে ফেরেননি।

 

নদীর পাড়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বর্ণার ছোটভাই মেহেদী হাসান মাহি বলেন, ‘শুক্রবার আপা (বর্ণা), তার এক বান্ধবী, ফুফু, আমাদের এক ভাড়াটিয়ার স্ত্রী, আমিসহ ছয় জন ঘাটে গোসলে আসি। তখন জোয়ার চলছিল। সবাই গোসলে ব্যস্ত ছিলেন। কেউ লাফ দিচ্ছিলেন, কেউ সাঁতার কাটছিলেন। আপাও দুবার গাছের গুঁড়ির ওপর থেকে লাফ দেন। পরের বার লাফ দিয়ে আর পানি থেকে ওপরে উঠতে পারেননি। সবাই যে যার মতো গোসলে ব্যস্ত থাকায় বুঝতে পারিনি। একপর্যায়ে বর্ণা আপাকে না পাওয়ায় খোঁজাখুঁজি শুরু করি আমরা।’

আহাজারি করতে করতে তিনি বলেন, ‘অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে না পেয়ে জেলেপাড়ার লোকদের খবর দিয়ে জাল টেনেও পাওয়া যায়নি। পরে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। খুলনা থেকে আসা ডুবুরি দলও উদ্ধারকাজে যোগ দেয়। শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান চালানো হলেও সন্ধান পাওয়া যায়নি। আজ ভোর থেকে বিকাল পর্যন্ত অভিযান চালিয়েও খোঁজ পাওয়া যায়নি। দুই-তিন কিলোমিটারেও খুঁজেও পাওয়া যায়নি।’

 

নদীর পাড়ে বর্ণার বাবা হাবিবুর রহমান বাকরুদ্ধ। মাঝে মধ্যে মেয়ের জন্য বিলাপ করছেন আর বলছেন, ‘আমার সব শেষ। আমার জামাইরে কী জবাব দেবো। জীবিত বা মৃত, যেভাবেই হোক আমার মেয়েটারে একবার দেখতে চাই।’

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *