আগামী ৩১ অক্টোবর ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা–খুলনা–কুষ্টিয়া লংমার্চের সমাপনী সমাবেশের স্থান নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। কুষ্টিয়া জিলা স্কুল চত্বরে সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে ১১ দলীয় ঐক্য। এ জন্য তারা মৌখিক অনুমতি পেয়েছিল বলে জানিয়েছে। কিন্তু জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আটটি শর্তে তাদের কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়াম ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এ নিয়ে কুষ্টিয়ায় আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। সমাবেশের স্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। শহরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যানার-ফেস্টুনে কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
গতকাল সোমবার (২৬ অক্টোবর) জেলা প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠক শেষে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির একেএম খন্দকার আলী মহসিন বলেন, আমরা জেলা প্রশাসক ও আগে বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারা জানিয়েছেন, কুষ্টিয়া জিলা স্কুলে ভেন্যু নির্ধারণ করার জন্য। আমরা সেভাবেই সব প্রস্তুতি নিয়েছি। জিলা স্কুলের মাঠে সমাবেশের জন্য বিভাগীয় কমিশনারেরও অনুমতি পাওয়া গেছে।
তবে জেলা প্রশাসনের অনুমতিপত্রে ভেন্যু হিসেবে কুষ্টিয়া শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়াম ব্যবহারের জন্য আটটি শর্তে অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের চিঠি সূত্রে জানা গেছে, ৩১ অক্টোবরের সমাবেশের জন্য স্টেডিয়াম ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে ১৩ অক্টোবর জেলা জামায়াতের প্যাডে আবেদন করেন সংগঠনটির জেলা সেক্রেটারি এনামুল হক। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে এবং জেলা পুলিশ সুপারের (জেলা বিশেষ শাখা) প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সোমবার (২৬ অক্টোবর) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার জাকিউল আলম স্বাক্ষরিত এক পত্রে আটটি শর্তে এ অনুমতি দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের জুডিসিয়াল মুন্সিখানা বিভাগ থেকে এ অনুমতি দেওয়া হয়।
শর্তগুলো হলো— ১. আইনশৃঙ্খলার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি হতে পারে, এমন কোনো কার্যকলাপ করা যাবে না। ২. জনসভাস্থলে শান্তি-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আয়োজক কমিটি স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করবে এবং তারা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে। ৩. জনসভায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে, এমন কোনো আলোচনা করা যাবে না। ৪. জনসভায় উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া যাবে না। ৫. জনসভা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে এবং মাঠ পরিষ্কার করে দিতে হবে। ৬. অনৈতিক কোনো কার্যকলাপ বা আয়োজক কমিটির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা দেখা দিলে, অথবা অনুরূপ যেকোনো কারণে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ যেকোনো সময় জনসভা বন্ধ করে দিতে পারবে। ৭. শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়াম মাঠ ছাড়া অন্য কোনো স্থান ব্যবহার করা যাবে না। অনুষ্ঠান চলাকালে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে আয়োজক কমিটি দায়ী থাকবে। ৮. মাইক ব্যবহারে সংযত হতে হবে, যাতে জনসাধারণের বিরক্তি সৃষ্টি না হয়।
এ বিষয়ে মুঠোফোনে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি এনামুল হক বলেন, আমাদের আগে থেকেই জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা হয়েছিল। তারা মৌখিকভাবে আমাদের জিলা স্কুলে ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচি করতে বলেছিল। আমরা সে অনুযায়ী সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। আমাদের পূর্বনির্ধারিত কুষ্টিয়া জিলা স্কুলেই ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে, ইনশাআল্লাহ।
একই দিনে সমাবেশের স্থান নিয়ে দুই ধরনের তথ্য সামনে আসায় পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এদিকে সোমবার রাতে এক বিজ্ঞপ্তিতে এনামুল হক জানান, কুষ্টিয়া জিলা স্কুল মাঠেই ৩১ অক্টোবর লংমার্চের সমাপনী সমাবেশ হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে তিনি বলেন—আগামী ৩১ অক্টোবর ১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত ঢাকা–খুলনা–কুষ্টিয়া লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে। এ কর্মসূচির সমাপনী সমাবেশ কুষ্টিয়ায় হওয়ার কথা রয়েছে। সমাবেশের স্থান নির্ধারণে প্রশাসনের সাম্প্রতিক ভূমিকা আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে। এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান সুস্পষ্ট।
সমাপনী সমাবেশ আয়োজনের লক্ষ্যে গত ১৩ অক্টোবর শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়াম মাঠ ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হয়। জেলা প্রশাসক বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে ওই মাঠে সমাবেশের অনুমতি দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং বিকল্প ভেন্যু নির্ধারণের পরামর্শ দেন। এর প্রেক্ষিতে আমরা কুষ্টিয়া জিলা স্কুল মাঠকে বিকল্প ভেন্যু হিসেবে নির্ধারণ করি। ১৮ অক্টোবর জিলা স্কুলের সভাপতি ও জেলা প্রশাসকের কাছে মাঠ বরাদ্দের জন্য আবেদন করা হয়। জেলা প্রশাসক ও খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের মৌখিক অনুমতির ভিত্তিতে আমরা সমাবেশের সার্বিক প্রস্তুতি শুরু করি। ইতোমধ্যে ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড ও হ্যান্ডবিলসহ প্রায় সব ধরনের প্রচার-প্রচারণা সম্পন্ন হয়েছে।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আজ ২৬ অক্টোবর, সমাবেশের মাত্র পাঁচ দিন আগে, জেলা প্রশাসক পুনরায় পূর্বের স্টেডিয়াম মাঠের প্রসঙ্গ তুলে নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি করছেন। কর্মসূচির এত কাছাকাছি সময়ে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। প্রশাসনের এমন ভূমিকা অতীতের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে বাধা সৃষ্টির অভিজ্ঞতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
আমরা এ ধরনের আচরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলগুলোর শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের অধিকার নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের কাছ থেকে আমরা দায়িত্বশীল, নিরপেক্ষ ও সহযোগিতামূলক ভূমিকা প্রত্যাশা করি। আমাদের অবস্থান সুস্পষ্ট। ইনশাআল্লাহ, পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আগামী ৩১ অক্টোবর কুষ্টিয়া জিলা স্কুল মাঠেই ঢাকা–খুলনা–কুষ্টিয়া লংমার্চের সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এ কর্মসূচি সফল করতে আমরা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, কর্তৃপক্ষ ও সর্বস্তরের জনগণের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি।
একই সঙ্গে আমাদের নেতাকর্মী, সমর্থক ও সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আহ্বান, আপনারা ধৈর্য, শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিন। কোনো ধরনের উসকানিতে সাড়া দেবেন না। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করুন এবং গণতান্ত্রিক ও সুশৃঙ্খল উপায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করুন। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি, গণতান্ত্রিক অধিকার ও জনসম্পৃক্ততার মধ্য দিয়েই আমরা এ লংমার্চের সমাপনী সমাবেশ সফল করতে বদ্ধপরিকর।
অন্যদিকে জিলা স্কুলের মাঠে সমাবেশের ঘোষণার প্রতিবাদে সোমবার সকালে স্কুলের সামনে বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছেন।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির ও কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) সংসদ সদস্য আব্দুল গফুর বলেন, এই বিষয়টি আমাদের হাতে নাই। এটি ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত। আমরা কোনো রকমে ভেন্যু চেঞ্জ করতে পারবো না। প্রশাসন আমাদের মৌখিকভাবে যেই ভেন্যু নির্ধারণ করে দিয়েছিল সেই অনুযায়ী আমরা লিফলেট ফেস্টুন ব্যানার প্রচার করেছি। এই ভেনু নির্বাচনের বিষয়টি আমরা কেন্দ্রীয় কমিটিকে অবহিত করেছি। কেন্দ্রীয় কমিটি যে সিদ্ধান্ত দেবে সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। এখনো পর্যন্ত আমরা আমাদের অবস্থানে ঠিক আছি।
এ বিষয়ে জানতে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসানকে একাধিকবার মুঠোফোনে কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
রবিউল আলম ইভান/আরএআর

