চব্বিশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দেশের রাজনীতিতে এখন খুবই আলোচিত। নির্বাসিত থেকে বিভিন্ন সময় বিচ্ছিন্নভাবে তিনি আলোচনায় এলেও এবারের প্রেক্ষাপট অনেকটা ভিন্ন। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নেতাকর্মীদের নিয়ে তার দেশে ফেরা এবং আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণায় চলছে নানামুখী বিশ্লেষণ।
দেখা দিয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। কূটনৈতিক মহল বা বিভিন্ন দেশও বিষয়টির ওপর নজর রাখছে। আওয়ামীবিরোধী বলয় তাকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিরোধের চিন্তাভাবনা করছে বলে জানা গেলেও আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত বলে মনে করছেন অনেকে। আবার কেউ কেউ বলছেন এই ঘোষণা এলে তৃণমূলে দলের কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখার একটি কৌশল মাত্র।
শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন নাকি এটি তার ফাঁকা বুলি এই বিতর্কের মাঝেই বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের পক্ষ থেকেই আইনি দিকগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রাজনীতি, দেশের প্রাচীন একটি দলের প্রধান কিংবা বারবার রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তির পরিচয়ের বাইরেও শেখ হাসিনা এখন একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। এ ছাড়া শেখ হাসিনার ফেরার মতো পরিস্থিতি এলে দেশের আইনশৃঙ্খলা অবনতি হতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে তার দেশে ফেরার ঘোষণা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ বলে দাবি করছেন বোদ্ধারা।
সাম্প্রতিক নির্বাসিত জীবনে ব্যক্তিগত কথোপকথন বা দলের ওয়েবিনারে এবং কিছু বিদেশি গণমাধ্যমে দেশে ফেরার ব্যাপারে অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেও এই প্রথম একটি ডেটলাইন সামনে এনেছেন শেখ হাসিনা। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দলীয় শীর্ষ নেতাদের নিয়ে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়েছেন।
একদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধের মতো প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার ফিরতে পারার মতো পরিস্থিতি আদৌ কতটা রয়েছে, তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় ব্যাপক জনরোষের মুখে দেশ ছাড়তে হয় আওয়ামী লীগের এই শীর্ষ নেতাকে। দুই বছর পর এসে সেই পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি ও প্রত্যর্পণের অনুরোধ পাঠিয়েছে। আবার শেখ হাসিনার ভারতে থাকা নিয়ে দিল্লির অবস্থানের কোনো পরিবর্তনও হয়নি বলে জানা যাচ্ছে। এরই মধ্যে তার দেশে ফেরার ঘোষণা ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একটি বড় পরীক্ষা।
সেই পরীক্ষার আগেই তুমুল আলোচনায় হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা। আদৌ শেখ হাসিনা দেশে ফেরবেন? নাকি এটা কোনো রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্টান্টবাজি, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো তার বিরুদ্ধে ঝুলতে থাকা শত শত মামলা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডের রায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন ঘটনায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সারা দেশে ৬৬৩টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে কেবল হত্যা মামলাই ৪৫৩টি। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গত বছরের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি হওয়ায় দেশে ফেরা মাত্রই বিমানবন্দর বা সীমান্ত থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হবে। তবে রায়ের পর আপিলের নির্ধারিত সময় পার হলেও তিনি যখনই বাংলাদেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করবেন, সাজার রায়ের বিরুদ্ধে তার আপিল করার সুযোগ থাকবে। শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে এই আদালত কতটা ‘প্রহসনমূলক’ তা স্পষ্ট হবে এবং তিনি সেটিই প্রমাণ করতে চান। অন্যদিকে, সরকারের তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান ১৪ জুলাই স্পষ্ট করেছেন যে, ‘বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হবে। শেখ হাসিনা চাইলে বিশ্বের যে কোনো দেশের আইনজীবী নিয়োগ করতে পারবেন এবং আদালত যে রায় দেবেন সরকার তা মেনে নেব। সরকারের লক্ষ্য কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্যবস্তু করা নয়; বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।’
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ব্যাপারে আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহ্দীন মালিক বলেন, ‘শেখ হাসিনার দেশে ফেরা তো সম্পূর্ণ নির্ভর করবে ভারত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। অতীতে যখন কোনো সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান অন্য কোনো দেশে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন, তখন তাদের ফেরানোর দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। ভারতের সঙ্গে হাসিনার যে সম্পর্ক; ’৭৫-এর পরও তো তিনি ৬ বছর সেখানে ছিলেন।
সম্পর্কের কারণে ভারত তাকে ফিরিয়ে দেবে বলে মনে করি না। বিশেষত যখন অন্য দেশে কেউ আশ্রয় প্রার্থনা করে তখন ওই দেশ যদি মনে করে, স্বদেশে তার ন্যায়বিচার হয় নাই, সেক্ষেত্রে ফেরত দেওয়ার পরিস্থিতি খুবই কম থাকে।
এক প্রশ্নের জবাবে ড. শাহ্দীন মালিক বলেন, যদি ধরেও নেওয়া হয়, কোনোভাবে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেন তারপর যেহেতু তার মৃত্যুদণ্ড হয়ে আছে, তাকে সরাসরি কারাগারে নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, বিগত সময়ে বিএনপির নেতাদের অনুপস্থিতিতে তো বিচার হয়ে সাজা হলো। তারপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ফিরে এসে তাদের সব সাজা মওকুফ হয়ে গেল। ওইরকম হলে অন্য কথা। তবে সেই ধরনের পটপরিবর্তন সহসা হওয়ার সুযোগ নেই।
শেখ হাসিনা নিজেই সাক্ষাৎকারে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার বা এমনকি হত্যার শিকারও হতে হতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আওয়ামী লীগের ওপর ব্যাপক জনরোষের কারণে বর্তমান পরিবেশ দলটির জন্য ‘সম্পূর্ণ বৈরী’। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগ ও এর সব সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, তা সংসদেও অনুমোদিত হয়েছে। ফলে দেশের ভেতরে দলটির কোনো রাজনৈতিক তৎপরতা চালানো আইনত সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার এই ঘোষণা মূলত আত্মগোপনে বা নির্বাসনে থাকা নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করার একটি কৌশলও হতে পারে।
ভারতের পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, ভারতের প্রচ্ছন্ন সমর্থন বা সম্মতি ছাড়া শেখ হাসিনা দেশে ফেরার এই বক্তব্য দেননি। শেখ হাসিনা যদি সত্যিই দেশে ফিরে যান তবে ভারত দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অস্বস্তি থেকে মুক্তি পাবে। আর যদি অনুকূল পরিবেশের অভাবে ফিরতে না পারেন, তাহলেও ভারত বলতে পারবে যে পরিস্থিতিই তাকে থাকতে বাধ্য করছে। তার এই বক্তব্য কূটনৈতিক চালেরও একটা অংশ হতে পারে।
গত দু’বছর ধরেই ভারতের ঘোষিত অবস্থান হলো—একটি বিশেষ নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা যখন ভারতের কাছে আশ্রয় চেয়েছিলেন, তখন তার সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্যই সেই আবেদনে সাড়া দেওয়া হয়েছিল।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল গত ১৪ জুলাই জানিয়েছেন, শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারতের নীতিগত অবস্থানের কোনো বদল ঘটেনি। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বা নিরাপদ প্রত্যাবর্তন একটি সম্পূর্ণ ‘আইনি বিষয়’ এবং এ-সংক্রান্ত যে কোনো সিদ্ধান্ত বিদ্যমান আইন ও চুক্তি মেনেই আইনি প্রক্রিয়াতেই নিষ্পত্তি হবে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ বক্তব্যের মাধ্যমে ভারত এটাই বোঝাতে চায় যে, তারা নিজে থেকে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিতে চায়নি বা তার দেশ ছেড়ে চলে আসাতেও তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। এটাও বাস্তবতা যে গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের নোট ভার্বাল বা আনুষ্ঠানিক অনুরোধে কোনো জবাব দেয়নি। ফলে ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার উপস্থিতি যে একটি অস্বস্তির উপাদান হয়ে রয়ে গিয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব কূটনৈতিক বিশ্লেষক এ কে এম আতিকুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘আপাতত বাংলাদেশের যে এখন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তাতে ওই পরিস্থিতি এখনো সৃষ্টি হয়নি যে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে এখন পা রাখতে পারবেন। তবে ভবিষ্যতের কথা বলা যায় না। ডিসেম্বর তো আরও পাঁচ-ছয় মাস আছে বা এই ডিসেম্বরে আদৌ আসবেন না পরের ডিসেম্বরে সেটাও আমার সন্দেহ। তবে উনি যদি একান্তভাবে আসতে চান, সেই কথাটা যদি সঠিক হয় তা হলে দেশে সেই রকম অবস্থান সৃষ্টি করে উনি আসবেন। উনি যখন এখানে এসে টিকে থাকতে পারবেন, রাস্তায় থাকতে পারবেন, ঘরে থাকতে পারবেন, নেতাকর্মীদের নিয়ে ওই অবস্থা ওই পরিস্থিতিটা যখন হবে বা ওই ধরনের ইকুয়েশন ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের হবে, হ্যাঁ যে ওই অবস্থায় ওনাকে দিলে অন্ততপক্ষে মেরে ফেলবে না তাহলে হয়তো আসবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর খুনিরা যখন বিভিন্ন দেশে কানাডায়, আমেরিকায় বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে রয়েছে, তাদের আনতে পারছে? পারে নাই। আর শেখ হাসিনা তো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, তারপর বঙ্গবন্ধুর কন্যা। সুতরাং তাকে ফেরত আনাও অত সহজ না।’
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, আইনি জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক সমীকরণে হাসিনার এই প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত জটিল এবং নানামুখী চ্যালেঞ্জে ঘেরা বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, আইন বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক নেতারা। তবে বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে রাজনৈতিক সমঝোতা। সমঝোতা হলেই কেবল তিনি সহজে দেশে ফিরতে পারবেন। সমঝোতার মাধ্যমে ফিরলেও তাকে দেশে ফিরে কারাগারে যেতে হবে।
‘যা বলছেন রাজনীতিবিদরা’ বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কালবেলাকে বলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চাইলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে হবে। তবে তার সেই সৎসাহস আছে বলে মনে করি না। তার ভাষ্য, শেখ হাসিনা নেতাকর্মীদের বিপদের মুখে রেখে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিদেশে চলে গেছেন। এমনকি তিনি আওয়ামী লীগ সংগঠনের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবেননি।
তিনি আরও বলেন, দেশে ফেরার বিষয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্য মূলত ‘ফাঁকা আওয়াজ’। আওয়াজ দিয়ে দেখছেন দেশে কী হয়? নেতাকর্মীরা আবারও তার জন্য মাঠে নামছেন কি না? তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে রাজনৈতিক সমীকরণে তিনি সহসা দেশে আসবেন বলে মনে হয় না।
মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই দলটিকে বর্তমানে ‘পরিবার লীগ’ বলে অভিহিত করেন। তারা মনে করেন, শেখ হাসিনা সবার আগে নিজের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন, পরিবারের লোকজনকে আগে বিদেশে পাঠিয়েছেন। কিন্তু দলের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেননি, একবারের জন্য নেতাকর্মীদের বিপদের কথাও চিন্তা করেননি। এখন দেশে ফেরার কথা বলে তিনি পরিস্থিতি যাচাইয়ের চেষ্টা করছেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার কালবেলাকে বলেন, শেখ হাসিনাকে নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ দেখেছি, তবে এসব তথ্য কতটা সত্য-মিথ্যা, তা আগে যাচাই করা প্রয়োজন। এর আগে তিনি অনেক কথা বলেছেন। কোনো ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় আইনের প্রতি সম্মান জানিয়ে নিজেকে আইনের কাছে সোপর্দ করার সিদ্ধান্ত নেন, সেটি সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত বিষয়।
তিনি বলেন, দেশের নাগরিক হিসেবে যে কোনো ব্যক্তির আইনের আশ্রয় নেওয়া এবং আইনগত সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করার অধিকার রয়েছে। যদি শেখ হাসিনা নিজে দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, সেটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। এ ক্ষেত্রে আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে।
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু কালবেলাকে বলেন, শেখ হাসিনা আত্মসমর্পণে রাজি হয়েছেন, এটা শুনে খুব ভালো লাগল। এ উপলব্ধি তার আরও আগে হলে এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা না করে যদি কালকেই দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করতেন সেটা বরং বেশি ভালোই হতো। মঞ্জু আরও বলেন, অনেকে শেখ হাসিনার কথাকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন না। অতীতে এ ধরনের নানা কথা বললেও তিনি কথা রাখেননি। আমি এবার বিশ্বাস রাখতে চাই, কারণ তার বয়স হয়েছে। মৃত্যুর আগে অতীতের ভুল শোধরানোর একটা সুযোগ তিনি কাজে লাগালে খারাপ হবে না বলে মনে করি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপির) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, শেখ হাসিনা কীভাবে আসবে, তার সঙ্গে কারা কারা আসবে, সে আত্মসমর্পণ করবে কি না, এটা ঠিক করবে বাংলাদেশ সরকার। এ বিষয়টি দিল্লির সঙ্গে ঢাকার কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ওপর নির্ভর করবে। এখানে আর কোনো পক্ষ নেই। ফলে সরকারই ঠিক করবে তাকে কখন, কীভাবে আনা হবে এবং কীভাবে বিচারের রায় কার্যকর করবে—সব প্রস্তুতি নিয়েই তাকে আনতে হবে।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, শেখ হাসিনার অবস্থান ও বক্তব্যও দিল্লির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। দিল্লি থেকে তাকে যতটুকু পারমিট করা হয়, সে অনুযায়ী তিনি কথা বলেন। আওয়ামী লীগ তো এখন কোনো রাজনৈতিক দলই নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীরা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত। শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগকে ঘিরে যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হয়, সরকার যদি সেটাকে প্রশ্রয় দেয়, তাহলে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশের আপামর জনগণ, জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী সব পক্ষ, ত্রিশ হাজার আহত ও এক হাজার ৪০০ শহীদ পরিবারের সদস্য, আমরা সবাই প্রস্তুত আছি।
আইনে কী আছে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পলাতক অপরাধী বিনিময়ের আইনি ভিত্তি হলো বাংলাদেশের ‘বন্দি প্রত্যর্পণ আইন, ১৯৭৪’ এবং ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত ‘ভারত-বাংলাদেশ বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি’। এই আইনি কাঠামোর অধীনে উভয় দেশ গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তিদের নিজেদের দেশে ফিরিয়ে আনতে পারে। ১৯৭৪ সালের আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী, সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে যে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রকে এ আইনের আওতাভুক্ত করতে পারে। ১৫ ধারা অনুযায়ী, বিদেশে পলাতক কোনো অপরাধীকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে আবেদন করতে পারে। ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ২০১৬ সালে এটি সংশোধিত হয়।
চুক্তির আওতায়, যেসব অপরাধের সাজা কমপক্ষে এক বছর বা তার বেশি, শুধু সেসব অপরাধের ক্ষেত্রেই প্রত্যর্পণ কার্যকর করা যায়। প্রত্যর্পণ না করার শর্তাবলির মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক অপরাধ; অর্থাৎ কোনো অপরাধকে যদি ‘রাজনৈতিক প্রকৃতির’ বলে বিবেচনা করা হয়, তবে অভিযুক্তকে প্রত্যর্পণ করা যায় না। তবে হত্যা, অপহরণ এবং নাশকতার মতো গুরুতর অপরাধগুলোকে রাজনৈতিক হিসেবে গণ্য করা হয় না। চুক্তি অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্র তার নিজের দেশের নাগরিককে অন্য কোনো দেশের হাতে তুলে দিতে বাধ্য নয়।
এ ছাড়া ন্যায়বিচারের স্বার্থে, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে বা প্রমাণাদির অভাবে অনুরোধকারী রাষ্ট্র যদি প্রত্যর্পণের আবেদন খারিজ করতে চায়, তবে তা করতে পারে। সরকারের অবস্থান বর্তমান সরকারের বক্তব্য তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যেসব মামলা ও বিচারিক কার্যক্রম চলছে, সেগুলোর আলোকে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অর্থাৎ সরকারের অবস্থান রাজনৈতিক নয়, বরং আইনি কাঠামোর মধ্যে বিষয়টি দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকারের মতে, কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা থাকলে এবং আদালত প্রয়োজন মনে করলে তাকে বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে আইনি দাবি উত্থাপন করলেই যে প্রত্যর্পণ নিশ্চিত হবে, বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়।
গত ১৪ জুলাই সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হওয়ায় দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ায় আদালতের রায় কার্যকর করা হবে। শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে সরকার প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে ধারাবাহিকভাবে তাগাদা দিয়ে যাচ্ছে।’
দেশে ফেরার বাস্তবতা কতটা বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে দেখা যায়। প্রথমত, বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরাতে আগ্রহী বলে প্রকাশ্যে জানিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় আইনি কাঠামো বিদ্যমান।
তৃতীয়ত, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চতুর্থত, রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যর্পণ সাধারণ অপরাধমূলক মামলার তুলনায় অনেক বেশি জটিল।
পঞ্চমত, এখন পর্যন্ত এমন কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি, যা থেকে বলা যায় যে, খুব শিগগির প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে যাচ্ছে।
ফলে নিকট ভবিষ্যতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত বলা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি সম্পূর্ণ অসম্ভব বলাও বাস্তবসম্মত হবে না। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রশ্নটি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের দাবি ও জল্পনা থাকলেও বাস্তবতা হলো, বিষয়টি এখনো আইন, কূটনীতি এবং রাজনৈতিক বিবেচনার জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরাতে আগ্রহী, কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। অন্যদিকে ভারতের সিদ্ধান্তও হবে বহুমাত্রিক বিবেচনার ফল। ফলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা শুধু একটি ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এটি দুই দেশের সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক আইন এবং আঞ্চলিক রাজনীতির বৃহত্তর সমীকরণের অংশ।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চান। তিনি অতীতেও মাথা উঁচু করে দেশে ফিরেছেন। সব নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি দেশে ফেরেন। আবার ২০০৭ সালের মে মাসে তিনি সেনাসমর্থিত সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশে ফেরেন। তিনি বলেন, বর্তমানে জাতির কাছে এ বিষয়টি পরিষ্কার যে, জুলাই আন্দোলন কোনো আন্দোলন নয়, এটা সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্ত। ড. ইউনূস দেশ ও দেশের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।
দুই মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথম মামলা দায়ের হয়। এ মামলায় ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যা এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনাকে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রাজসাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হওয়ায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান পলাতক থাকায় তাদের আত্মসমর্পণ বা গ্রেপ্তারের পর সাজা কার্যকর হবে।
এ ছাড়া গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা শাকিল আকন্দ বুলবুলের কথিত একটি টেলিফোন কথোপকথন প্রকাশের পর ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগে বলা হয়, ওই কথোপকথনের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা, মামলার বাদী, সাক্ষী ও তদন্ত কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হুমকি দেওয়া হয়েছে। শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ২ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং শাকিল আকন্দ বুলবুলকে দুই মাসের কারাদণ্ড দেন। ট্রাইব্যুনাল জানান, আত্মসমর্পণ বা গ্রেপ্তারের দিন থেকে সাজা কার্যকর হবে।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *