২৪ অক্টোবর ২০২৬ | রাত ৩:৪০:০৯ মিনিট

সৌদি আরবের কারাগারে থাকা ২২ বাংলাদেশির নামের পাশে লেখা ‘দণ্ডপ্রাপ্ত’। কিন্তু তাঁদের কী শাস্তি হয়েছে, কত বছরের কারাদণ্ড, নাকি মৃত্যুদণ্ড, সৌদি সরকারের পাঠানো তালিকায় তার কিছুই লেখা নেই। জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটও তা জানে না।

এই ২২ জনের মধ্যে ছিলেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার, যাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে। তাঁদের মতো আরও ২০ জনের ভাগ্য এখন অনিশ্চিত। তাই তাঁদের কী সাজা দেওয়া হয়েছে, তা জানতে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি দিয়েছে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট।

জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট ১৯ অক্টোবর সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জেদ্দা শাখায় ওই চিঠি দিয়েছে।

জানতে চাইলে জেদ্দায় বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মো. শাখাওয়াত হোসেন আজ বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের দণ্ডিত নাগরিকদের কনস্যুলার সুবিধা নিশ্চিত করার স্বার্থে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে সুস্পষ্ট তথ্য চাওয়া হয়েছে।

শাস্তির ফাঁকা কলাম নিয়ে প্রশ্ন

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২ হাজার ৪৬১ বাংলাদেশি বন্দীর একটি তালিকা পাঠায়। জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কর্মপরিধির এলাকায় কারাগারগুলোতে থাকা এসব বন্দীদের কারও বিরুদ্ধে আদালতের রায় হয়েছে, কারও মামলা চলছে। তালিকা খুঁটিয়ে দেখে কনস্যুলেট লক্ষ করে, কয়েকজনের ‘অবস্থা’ কলামে ‘দণ্ডপ্রাপ্ত’ লেখা থাকলেও ‘রায়ের সারসংক্ষেপ’ কলাম ফাঁকা। শাস্তির ধরন বা মেয়াদ, কোনোটিই নেই।

১৯ অক্টোবর চিঠিতে কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা অঞ্চল শাখাকে (জেদ্দা) অনুরোধ করে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত রায়ের সারসংক্ষেপ পাঠাতে। চিঠিতে বলা হয়েছে, কনস্যুলার দায়িত্ব পালনের জন্য এ তথ্য প্রয়োজন। সঙ্গে সংযুক্ত ৯ পাতার তালিকায় ওই বন্দীদের বিবরণ রয়েছে। চিঠিতে কতজনের কলাম ফাঁকা, তা বলা হয়নি। সংযুক্ত তালিকা গুনে পাওয়া গেছে ২২ জন।

২২ জনের বিরুদ্ধ মামলার ধরন

জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সূত্রগুলো জানিয়েছে, সৌদি আরবের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, ২২ জনের মধ্যে ৮ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলায় বিচার হয়েছে। পাঁচজনের বিরুদ্ধে মাদক পাচার এবং পাঁচজনের বিরুদ্ধে ‘ব্যক্তিগত অধিকার’–সংক্রান্ত মামলা । দুজনের মামলা রাষ্ট্রীয় আইন লঙ্ঘনের, একজনের সাইবার অপরাধের এবং একজনের ব্যভিচারের। ছয়জন আছেন জেদ্দার জাহবান কারাগারে, ছয়জন শুমাইসিতে, চারজন জেদ্দা জেনারেল কারাগারে। বাকি ছয়জন নাজরান, খামিস, আল-বাহা, হাদ্দাহ ও জেদ্দার নারী কারাগারে।

উল্লেখযোগ্য আরেকটি বিষয়, ‘ব্যক্তিগত অধিকার’–সংক্রান্ত মামলার পাঁচজনই শুমাইসি কারাগারে। সাধারণত এ ধরনের মামলা ব্যক্তিগত দাবি বা ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত হয়। তবে নির্দিষ্ট অভিযোগ কী, তা মামলার নথি ছাড়া নিশ্চিত নয়।

তবে মামলার ধরন দেখে শাস্তি অনুমান করা যায় না। সৌদি আইনে হত্যা মামলায় কিসাস (মৃত্যুদণ্ড) হতে পারে, আবার রক্তপণ বা কারাদণ্ডেও নিষ্পত্তি হতে পারে। তাই তালিকার কারও ক্ষেত্রেই মৃত্যুদণ্ডের কথা বলা যাচ্ছে না, আবার বাদও দেওয়া যাচ্ছে না।

রায় না জানার ঝুঁকি

সৌদি আরবে গুরুতর অপরাধে শাস্তির পর রায় না জানার ফল কী হতে পারে, নজরুল ইসলাম আর সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া তার সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত। রায়ের সারসংক্ষেপ না থাকলে কনস্যুলেট জানে না, কার সামনে কোন পথ খোলা। আপিলের সুযোগ আছে কি না, আইনজীবী কীভাবে নিয়োগ হবে, রক্তপণের মীমাংসা বা ক্ষমার উদ্যোগ নেওয়া যাবে কি না—সবই নির্ভর করে রায়ের ওপর। দেশে বসে পরিবারগুলোও একই অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। সে কারণে নজরুল ও সুইটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানার পর এ বিষয়ে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশের জেদ্দা কনস্যুলেট।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে জেদ্দা কনস্যুলেটের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ দণ্ডিত ব্যক্তিদের সাজার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চেয়ে যে অনুরোধ জানিয়েছে, তা তাদের তথ্যভান্ডার হালনাগাদ করা এবং নাগরিকদের সর্বোত্তম কনস্যুলার সেবা দেওয়ার চেষ্টার অংশ। অর্থাৎ তালিকার ঘাটতি পূরণ না হলে কনস্যুলেটের নিজস্ব রেকর্ডও অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, সৌদি কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত রায়ের তথ্য দেয় এবং সেই তথ্যে কার কী শাস্তি বেরিয়ে আসে।

ক্ষমা ও দেশে ফেরার আবেদনও

১৯ অক্টোবর জেদ্দা কনস্যুলেট আরেকটি চিঠিতে ২ হাজার ৪৬১ জন বন্দীকে পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করে বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছে। মেয়াদ শেষ হওয়া বন্দীদের দ্রুত মুক্তি ও দেশে ফেরত, ভালো আচরণ করা বন্দীদের রাজকীয় ক্ষমার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি, প্রথমবার আটক ও ছোট অপরাধে আটক ব্যক্তিদের অবশিষ্ট সাজা মওকুফ এবং বিচারাধীন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

কনস্যুলেট আরও দুজন বাংলাদেশির বিষয়ে সৌদি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। তাঁদের পরিবার জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের গ্রেপ্তার করেছে, কিন্তু কেন গ্রেপ্তার করা হয়েছে বা কোন জায়গা থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেটা তারা জানে না।

কনস্যুলেটের এসব চিঠির বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের জবাব এখনো জানা যায়নি।

 



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *