১৪ অক্টোবর ২০২৬ | রাত ৬:২৮:৪৪ মিনিট

কেউ মেধাবী প্রকৌশলী হয়েও বেছে নিয়েছেন কোমলমতি শিশুদের গড়ার পথ, কেউ দুই হাত না থাকলেও পা দিয়ে লিখে প্রতিষ্ঠা করেছেন বিদ্যালয়, আবার কেউ নিজের সম্পদ ও শ্রম ব্যয় করে তিন দশক ধরে লাগিয়ে চলেছেন হাজার হাজার গাছ। ব্যতিক্রমী জীবনসংগ্রাম আর মানুষের জন্য কিছু করার অদম্য ইচ্ছাশক্তির এমন তিন গল্প শুনেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাদের কাজের প্রশংসা করার পাশাপাশি পাশে থাকার ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই তিন অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী। তারা হলেন- বুয়েট থেকে পাস করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বেছে নেওয়া নায়লা শারাফ, দুই হাত ছাড়াই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা নরসিংদীর মো. আলতাফ হোসেন এবং নিজের উদ্যোগে হাজার হাজার গাছ লাগিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা ভোলার চরফ্যাশনের রেজাউল কিবরিয়া বাবুল।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তারা। প্রধানমন্ত্রীও তাঁদের জীবনসংগ্রাম, ব্যতিক্রমী পেশা নির্বাচন, প্রতিকূলতা জয় করে এগিয়ে চলা এবং সমাজের কল্যাণে নেওয়া উদ্যোগের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশ গঠনে আপনাদের মতো মানুষের অনেক প্রয়োজন। আপনাদের মতো সবাই এগিয়ে এলে দেশ গঠন সহজ হবে।’

প্রকৌশলী হয়েও শিশুদের গড়ার স্বপ্ন নায়লার
মেধা, যোগ্যতা ও কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার একাধিক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নায়লা শারাফ বেছে নিয়েছেন শিশুদের শিক্ষাদানের পথ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। পরে কাজ করেন জনতা ব্যাংকেও। ৩৪তম বিসিএসে রিটেনে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও ভাইভা না দিয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ না দিয়ে শিশুদের মানুষ করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন তিনি।

গত সাত বছর ধরে নেত্রকোনার পাঁচআননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন নায়লা। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াশোনা সহজ ও আনন্দময় করে তুলতে নিজ উদ্যোগে তৈরি করছেন শিক্ষা উপকরণ ও ডিজিটাল কনটেন্ট।

প্রচলিত সাফল্যের সংজ্ঞায় যেখানে ভালো চাকরি ও পেশাগত প্রতিষ্ঠাকে বড় করে দেখা হয়, সেখানে শিশুদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলাকেই নিজের দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছেন নায়লা। তার এই ব্যতিক্রমী পেশা নির্বাচন ও শিক্ষার প্রতি নিষ্ঠার কথা শুনে প্রধানমন্ত্রী তাঁর উদ্যোগের প্রশংসা করেন।

দুই হাত নেই, তবু নিজের হাতে গড়েছেন শিক্ষার আলো ছড়ানোর প্রতিষ্ঠান
নরসিংদীর মো. আলতাফ হোসেনের জীবন যেন প্রতিকূলতাকে জয় করার এক অনন্য উদাহরণ। জন্ম থেকেই তার দুই হাত নেই। কিন্তু শারীরিক সীমাবদ্ধতা তার স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারেনি। পা দিয়ে লেখালেখি শিখে সেই পায়ের শক্তিতেই এগিয়ে নিয়েছেন নিজের জীবন, গড়ে তুলেছেন অন্যদের শিক্ষিত করার প্রতিষ্ঠান।

২০০৭ সালে নরসিংদীর পাঁচদোনায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন প্রতিভা দুঃখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন স্কুল। নিজের সঞ্চয় ও পৈতৃক জমি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দিয়ে গড়ে তোলা বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে পড়াশোনা করছে ১৪৫ জন শিক্ষার্থী। তাদের পাঠদানের জন্য রয়েছেন ১০ জন শিক্ষক। নিজের দৈনন্দিন কাজের পাশাপাশি পা দিয়েই লেখালেখি করেন এবং বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন আলতাফ।

প্রতিকূলতার কাছে হার না মেনে নিজের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছেন তিনি। তবে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন তার উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নেওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আলতাফের কথা শুনে প্রধানমন্ত্রী নতুন স্কুল ভবন নির্মাণ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

নিজের সম্পদ ব্যয় করে তিন দশক ধরে বৃক্ষরোপণ
ভোলার চরফ্যাশনের রেজাউল কিবরিয়া বাবুলের অনুপ্রেরণা প্রকৃতি ও মানুষের কল্যাণ। মসজিদে ইমামতির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রায় তিন দশক ধরে নিজের অর্থ, শ্রম ও সময় ব্যয় করে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছ লাগিয়েছেন তিনি।

বৃক্ষরোপণের এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে নার্সারি গড়ে তোলেন বাবুল। সেখান থেকে উৎপাদিত চারা বিভিন্ন এলাকায় রোপণ করতে থাকেন। তার লাগানো অনেক গাছ এখন বড় হয়েছে। পথচারীদের রোদ থেকে ছায়া দিচ্ছে, পরিবেশের সৌন্দর্য বাড়াচ্ছে। নিজের উদ্যোগে লাগানো এসব গাছের সুফল ভোগ করছেন এলাকার মানুষ।

ব্যক্তিগত লাভের হিসাবের বাইরে গিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশের জন্য কাজ করে যাওয়া বাবুলের এই উদ্যোগও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তার কাজের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী এবং এ ধরনের জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে উৎসাহ দেন।

তিনজনের তিনটি উদ্যোগের ধরন আলাদা হলেও তাদের লক্ষ্য এক জায়গায় মিলেছে—নিজের সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেই মানুষের জন্য কিছু করা। কেউ শিশুদের হাতে তুলে দিচ্ছেন শিক্ষার আলো, কেউ নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতা জয় করে অন্যদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছেন, আবার কেউ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গড়ে তুলছেন সবুজের ছায়া।

প্রধানমন্ত্রী তাদের প্রত্যেকের উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, সমাজ ও দেশের কল্যাণে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ করা মানুষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের উদ্যোগ অন্যদেরও ভালো কাজে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করবে।

সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী তাদের কাজ অব্যাহত রাখতে উৎসাহ দেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ব্যতিক্রমী এই তিন মানুষের জীবনসংগ্রাম ও জনকল্যাণমূলক কাজের স্বীকৃতি তাদের উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সমাজের অন্যদেরও মানুষের পাশে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *