
রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ততম এলাকা মহাখালী বাস টার্মিনালের যানজট কমাতে পূর্বাচলে চালু করা হয়েছে বাস ডিপো। পরিকল্পনা ছিল, দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাসগুলো নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা আগে পূর্বাচলের ডিপোতে অবস্থান করবে। পরে সিরিয়াল অনুযায়ী মহাখালী টার্মিনালে গিয়ে যাত্রী নিয়ে গন্তব্যে রওনা হবে। এতে মহাখালী এলাকায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাসের অবস্থান কমে যানজটও নিয়ন্ত্রণে আসবে।
গত ১৬ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে ডিপোটির উদ্বোধন করা হলেও ১৩ দিন পেরিয়ে যাওয়ার পরও এর সুফল দৃশ্যমান হয়নি। অধিকাংশ পরিবহন এখনো আগের ব্যবস্থাতেই চলাচল করছে। ফলে মহাখালীর যানজট কমানোর যে লক্ষ্য ছিল, তা বাস্তবে কার্যকর হতে পারেনি।
গত মঙ্গলবার দুপুরে পূর্বাচলের ৩ নম্বর সেক্টরে অস্থায়ী বাস ডিপো ঘুরে দেখা যায়, বিশাল ডিপো প্রায় ফাঁকা। বিভিন্ন পরিবহনের মাত্র ২০টি বাস সেখানে অবস্থান করছে। যেখানে শতাধিক বাসের আনাগোনা থাকার কথা, সেখানে হাতেগোনা কয়েকটি বাস দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দা আমানুল্লাহ বলেন, এলাকাটি আগে ‘আলামপুর ফকিরপাড়া’ নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে এটি পূর্বাচল ৩ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত।
সরেজমিন দেখা যায়, বিলাশ পরিবহন, আহনাল পরিবহন, ইকবাল পরিবহন, সাভার পরিবহন লিমিটেড, দিশারী পরিবহন সার্ভিস, সৌখিন সিটিং সার্ভিস, গ্রিন বাংলা এসি সার্ভিস, হাজী ট্রাভেল ও পিংকি ও হানিফ পরিবহনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বাস সেখানে রাখা হয়েছে। তবে অধিকাংশ পরিবহন এখনো ডিপোটি ব্যবহার করছে না। পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক বাস কোম্পানি এখনো আগের পদ্ধতিতেই পরিচালিত হচ্ছে। শুধু উদ্বোধন করলেই হবে না, সব পরিবহনকে কার্যকরভাবে এ ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।
অন্যথায় মহাখালীর যানজট কমানোর লক্ষ্য পূরণ হবে না। উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রাম রুটের পিংকি পরিবহনের চালক আলমগীর বলেন, প্রত্যন্ত জেলার কয়েকটি রুট থেকে সকালে ঢাকায় আসা কিছু বাস অস্থায়ীভাবে পূর্বাচল ডিপোতে রাখা হচ্ছে। তবে সব বাস এখানে আসে না। অনেক বাস ট্রিপ শেষ করে অন্যত্র চলে যায়। মূলত দূরবর্তী জেলার যাতায়াতকারী বাসগুলোই এখানে রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘চার দিন ধরে এখানে আছি। খাবারের সমস্যা ছাড়া এখন পর্যন্ত বড় কোনো সমস্যায় পড়িনি।’
আহনাল পরিবহনের সুপারভাইজার বাবু বলেন, ‘মহাখালী টার্মিনাল সব বাস মালিকের জন্য না, ওখানে সমিতিভুক্ত বাস ছাড়া অন্যরা রাখলে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। সে কারণে কিছু বাস পূর্বাচলে আসছে।’
তবে ডিপো ব্যবহার না করার পেছনে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথাও বলছেন চালক-শ্রমিকরা। তাদের অভিযোগ, এখনো খাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই। আশপাশে রেস্তোরাঁ না থাকায় কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়ে খাবার খেতে হয়।
সুনামগঞ্জ রুটের বিলাস পরিবহনের চালক মেহেদী হাসান বলেন, ‘বাস রাখার ব্যবস্থা হয়েছে; কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা খাবার। খেতে অনেক দূরে যেতে হয়। মানসম্মত টয়লেটও নেই।’
ট্রাফিক পুলিশের উদ্যোগে চালক-শ্রমিকদের জন্য তাবু, ফ্যান, খাট ও বিছানার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর পুলিশের উদ্যোগে সাবমার্সিবল পাম্পের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তবে মেঝে এখনো পাকা না হওয়ায় বালুর কারণে চলাফেরায় ভোগান্তি হচ্ছে। পাশাপাশি দিনের বেলায় তাঁবুর ভেতরে প্রচণ্ড গরমে অবস্থান করাও কষ্টকর বলে জানান সেখানে দায়িত্ব পালনকারী চালক-শ্রমিকরা।
দায়িত্বরত টিএসআই রফিকুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, মঙ্গলবারের তুলনায় বুধবার দুপুর ২টা পর্যন্ত পূর্বাচল বাস টার্মিনালে ১৪টি অতিরিক্ত বাস প্রবেশ করেছে। তিনি জানান, নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং রাজউক আশপাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কাজও চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আরও দুই-এক দিনের মধ্যে খাবারের ব্যবস্থা হবে।
সিটি করপোরেশনের লোকজন কাজ করছে। দুটি রেস্তোরাঁ চালুর প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি মূল সড়ক থেকে টার্মিনালে প্রবেশপথের গর্তগুলো রাজউকের লোকজন ভরাট করছে, যাতে বাসগুলো দ্রুত প্রবেশ ও বের হতে পারে। বিষয়টি দেখতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও পরিদর্শনে এসেছেন।
রাজউক পূর্বাচল সেক্টরের দায়িত্বে থাকা আনসারের সহকারী কমান্ডার মো. রুবেল হোসেন কালবেলাকে বলেন, পূর্বাচলের স্থায়ী বাস টার্মিনালে আনসার সদস্যরা স্থায়ীভাবে নয়, অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে প্রয়োজন অনুযায়ী ১০ থেকে ১৬ সদস্য পালাক্রমে সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। তবে তারা শুধু বাস টার্মিনাল নয়, পুরো পূর্বাচল এলাকায় টহল ও নিরাপত্তা কার্যক্রমের পাশাপাশি ডিপোর দায়িত্বও পালন করেন। তিনি জানান, পূর্বাচলে আনসারের মোট জনবল ৫০ জন। বিভিন্ন নিরাপত্তা পোস্টে দায়িত্ব পালনের কারণে জনবলের ওপর চাপ রয়েছে।
বাস টার্মিনাল কর্তৃপক্ষের অনুরোধে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে সাময়িকভাবে সেখানে আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হলে এ অস্থায়ী দায়িত্ব প্রত্যাহার করা হতে পারে।
বর্তমানে ডিপোতে রাজউকের ১৫ আনসার সদস্য, ট্রাফিক বিভাগ থেকে তিনজন এবং পুলিশ লাইন থেকে পালাক্রমে ১৮ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন।
রাজউকের হয়ে মাঠ উন্নয়নের কাজ করছে কনভয় সার্ভিস। প্রতিষ্ঠানটির প্রকৌশলী সুদীপ্ত সরকার বলেন, বর্তমানে ১৫০ ফুট বাই ৬০০ ফুট জায়গা বাস রাখার উপযোগী করা হচ্ছে। আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে এ অংশটি পুরোপুরি প্রস্তুত হবে। প্রায় ১০ একর জায়গাজুড়ে স্থায়ী বাস টার্মিনালে শেড, ওয়েটিং রুম, ক্যান্টিন, ওয়াশরুম, নামাজের স্থান এবং বাস ডিপো নির্মাণ করা হবে।
তবে সরেজমিন দেখা যায়, রাজউকের চলমান উচ্ছেদ কার্যক্রম এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ের অভাবে মাঠ উন্নয়নের কাজ ধীরগতিতে এগোচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর না হওয়া পর্যন্ত সব পরিবহনকে ডিপো ব্যবহারে উৎসাহিত করাও কঠিন হবে।
বুধবার সরেজমিন মহাখালী বাস টার্মিনালের তেজগাঁও-নাখালপাড়া (নাবিস্কো) এলাকার প্রধান সড়কের দুই পাশে শতাধিক বাস পার্কিং করে রাখা দেখা যায়। এ সময় কয়েকজন চালকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ করেন।
তবে অন্যান্য পরিবহনের চালক জসিম বলেন, ‘একটু পরই যাত্রী নিয়ে রওনা দিতে হবে।
তাই কিছু সময়ের জন্য এখানে অপেক্ষা করছি।’ একই ধরনের কথা বলেন জলসিঁড়ি পরিবহনের হেলপার আরমান। তিনি জানান, নির্ধারিত সময় হলে যাত্রী নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যাবেন। এ বিষয়ে কথা হয় ঢাকা জেলা বাস-মিনিবাস সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সহসভাপতি ইউসুফ মির্জার সঙ্গে। তিনি বলেন, বৃষ্টি কমে গেলে আগামী ১৫ তারিখের (আগস্ট ১৫) মধ্যে জায়গাটি গাড়ি রাখার উপযোগী হয়ে যাবে। তখন সেখানে গাড়ির সংখ্যাও বাড়ানো হবে।
জায়গাটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত হলে আরও অনেক গাড়ি এবং বিভিন্ন গ্যারেজ সেখানে সরিয়ে নেওয়া হবে। তবে বৃষ্টি হলে কাজ শেষ হতে দুই-তিন দিন দেরি হতে পারে। ইনশাআল্লাহ আগামী আগস্ট মাসের মধ্যেই সব কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫টি গাড়ি সেখানে যাচ্ছে। তবে খাবারের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় চালক-শ্রমিকদের ভোগান্তি হচ্ছে। পুলিশ কমিশনার কম মূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
আগস্টের মধ্যেই সব গাড়ি সেখানে চলে যাবে। ইঞ্জিনের বড় কাজ ও বডির কাজও সেখানে করা হবে। এখানে শুধু রানিং মিস্ত্রিরা গাড়ি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য থাকবেন।
ইউসুফ মির্জা আরও বলেন, রাজউকের কর্মকর্তা, পুলিশ কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার এবং তাদের নেতা শিমুল বিশ্বাস সাহেব—সবার সমন্বয়েই কাজটি এগিয়ে চলছে। তার আশা, আগামী মাসের ১৫ থেকে ২০ তারিখের মধ্যে কাজ শেষ হলে অধিকাংশ গাড়ি সেখানে চলে যাবে এবং তখন খাবারের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হবে।
