২৩ অক্টোবর ২০২৬ | রাত ২:৪২:৩৬ মিনিট

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে থাকছেন না টোকিওতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী। তাকে ঢাকায় রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারপ্রধানের সফরের ঠিক আগে রাষ্ট্রদূতকে সেখান থেকে সরানোর নজির নেই। তবে, বিগত সরকারপ্রধা‌নদের কোনো কো‌নো দেশ সফ‌রের আগে কনসাল জেনা‌রেল বা তার চে‌য়ে নি‌চের প‌দের কূটনী‌তিক‌দের ঢাকায় কিংবা অন্যত্র স‌রি‌য়ে নেওয়ার ন‌জির আছে।

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরে এ ধরনের দুই থেকে তিনটি ঘটনার নজির রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপানে সরকারি সফর করবেন তারেক রহমান। গত ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি হবে তার চতুর্থ বিদেশ সফর। এই সময় সফরের কূটনৈতিক বিষয় ও সার্বিক সমন্বয়ে সহায়তার জন্য বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে টোকিও পাঠানো হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলি) মো. নজরুল ইসলামকে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গত ১৫ অক্টোবর পাঠানো এক চিঠিতে প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে আলোচনার জন্য দাউদ আলীকে ঢাকায় ডেকে পাঠানো হয়েছিল। দুই দিনের মধ্যে দেশে ফেরার নির্দেশ মেনে তিনি জাপান থেকে ঢাকায় ফিরেছেন।

সরকারপ্রধানের সফরের ঠিক আগে রাষ্ট্রদূতকে সেখান থেকে সরানোকে ‘নজিরবিহীন’ বলে মনে করছেন সাবেক ও বর্তমান কূটনীতিকরা।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদেশে বাংলাদেশের একটি মিশনের এক রাষ্ট্রদূত বলেন, কী কারণে প্রধানমন্ত্রীর সফরে রাষ্ট্রদূতকে জাপানে রাখা হচ্ছে না, সেটা আমার জানা নেই। এ সফর নিয়ে জাপান সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রদূত আলাপ-আলোচনা করেছেন। হঠাৎ করে কী এমন হলো যে, প্রধানমন্ত্রী যাবার আগ মুহূর্তে তাকে ফেরাতে হবে? যদি ওনার বিরুদ্ধে কোনো কিছু থেকে থাকে, সেটা তো আরও আগে দেখার দরকার ছিল। সফরের আগে রাষ্ট্রদূত না থাকাটা জাপান সরকার কীভাবে দেখে, তা কিন্তু গুরত্বপূর্ণ বিষয়। যাকে এ সফর সামলানোর জন্য টোকিওতে পাঠানো হয়েছে, তিনি যোগ্য ব্যক্তি। কিন্তু গ্রাউন্ড রিয়েলিটি রাষ্ট্রদূত যতটা জানেন, তিনি স্বল্প সময়ে সেটা রপ্ত করতে পারবেন না; হয়ত চালিয়ে নিতে পারবেন।

প্রধানমন্ত্রীর সফরে রাষ্ট্রদূতকে বাদ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও এর কারণ বলেননি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও টোকিও দূতাবাসের কর্মকর্তারা। জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র একেএম শহীদুল করিম বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।

২০০৯ সালের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। সে সময় লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সেলর এবং হেড অব চ্যান্সারি ছিলেন দাউদ আলী। লন্ডনে তারেক রহমানকে (বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী) সহায়তার অভিযোগে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। তখন তার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এনএসআই একটি প্রতিবেদন দিয়েছিল।

তার ভিত্তিতে দাউদ আলীকে ঢাকায় ফেরানো হয় এবং ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমির ভাইস প্রিন্সিপাল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ১৭ বছর পর প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের আগে আবার দেশে ফেরার চক্রে পড়ে গেলেন সেই দাউদ আলী। তবে সরকারপ্রধানের সফর শেষে তিনি আবার টোকিওতে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনের জন্য ফিরে যাবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আগামী ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তারেক রহমান। বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে ৩ থেকে ৪টি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে।

গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর সামনে রেখে উভয় পক্ষের মধ্যে ৮টি সমঝোতা স্মারক সইয়ের বিষয়ে প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে ৩ থেকে ৪টি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে।

তিন দেশে বাংলাদেশ মিশনে নেতৃত্ব দেওয়া সাবেক এক রাষ্ট্রদূত বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে রাষ্ট্রদূতকে নিয়ে আসা হলো, তার মানে কিছু একটা ঝামেলা আছে। তবে এটা ‘নজিরবিহীন’ ঘটনা। এটা কখনো হয়নি। এটা জাপানিজরা কীভাবে নেবে, আমি জানি না। তবে তারা এটাকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার কথা না। এতদিন ধরে তারা যার সঙ্গে আলোচনা করছেন, সেই গেটওয়ে থাকবে না, এটা কীভাবে সম্ভব? জাপানের মতো একটা আত্মমর্যাদাশীল জাতি এটাকে কীভাবে নেবে, সেটা আমরা হয়ত চিন্তাও করিনি।

হয়ত কারও চাওয়াতে এমনটি হতে পারে বলে মনে করছেন সাবেক এই রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, আমাদের কারও চাওয়ার কারণে এটা হয়েছে। আমাদের দেশের কারও একজনের। এতে করে বাহিরে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হবে। যদি তাকে ফেরানোই হবে, সেটা আরও আগে করা উচিত ছিল।

রাষ্ট্রদূতকে ফেরানোর ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর সফরে নেতিবাচক প্রভাবের প্রশ্নে এই সাবেক রাষ্ট্রদূত বলেন, আমার মনে হয় না জাপানিরা এটা ভালোভাবে নেবে। রাষ্ট্রদূতের গ্রাউন্ড রিয়েলিটি চেনা, বিষয়টা মনে রাখতে হবে।

২০১৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরকালে কুনমিংয়ের তৎকালীন কনসাল জেনারেলকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। শেখ হাসিনা যখন কুনমিংয়ে ছিলেন তখন কনসাল জেনারেল ছিলেন বেইজিংয়ে। বর্তমান ওই কনসাল জেনারেল ইউরোপের একটি দেশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করছেন।

২০২৪-এর জুলাইয়ে শেখ হাসিনার চীন সফরের আগে বেইজিংয়ের বাংলাদেশ মিশনের এক কর্মকর্তাকে সপরিবারে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়। শেখ হাসিনার সফর শেষে ওই কর্মকর্তা আবার মিশনে ফিরে গিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি বিদেশে বাংলাদেশের মিশনে কনসাল জেনারেলের দায়িত্ব পালন করছেন।

সর্বশেষ, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরকালে বেইজিংয়ের বাংলাদেশ মিশনের এক কর্মকর্তাকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মুহাম্মদ ইউনূস যখন বেইজিং ছিলেন, ওই কর্মকর্তা চীনের অন্য শহরে ছিলেন।

১৫তম বিসিএস (পররাষ্ট্র ক্যাডার)-এর কর্মকর্তা দাউদ আলী এর আগে রোমানিয়ায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি টোকিও মিশনে ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করছেন। চলতি বছরের ৭ ডিসেম্বর তার অবসর-উত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ার কথা রয়েছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *