
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গত মঙ্গলবার রাতে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা পুলিশ লাইন্সে ঢুকে ভাঙচুর চালিয়েছেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উচ্চ শব্দে গান বাজানোর জেরে এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। পরে দুপক্ষের সংঘর্ষে ৪০ জন আহত হয়েছেন। ঘটনার সময় দায়িত্বরত তিন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। জেলা পুলিশ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
পুলিশ, মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আসেন। এ উপলক্ষে রাতে পুলিশ লাইন্সে জেলা পুলিশের উদ্যোগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে উচ্চ শব্দে গান বাজানোয় রাস্তার অপর পাশের দারুল আরকাম মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষার্থী গিয়ে আস্তে বাজানোর
অনুরোধ করেন। কিন্তু দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা বিষয়টি আমলে না নেওয়ায় দুপক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। খবর পেয়ে বেশ কিছু শিক্ষার্থী পুলিশ লাইন্সে প্রবেশ করে অনুষ্ঠানস্থলে ভাঙচুর করেন। এক পর্যায়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জ শুরু করে। শিক্ষার্থীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। দুপক্ষের সংঘর্ষ শুরু হলে আশপাশ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ সময় উভয় পক্ষের অন্তত ৪০ জন আহত হন।
মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষার্থী জানান, মঙ্গলবার রাতে পুলিশ লাইন্সে সংগীতানুষ্ঠান চলছিল। গানের উচ্চ শব্দের কারণে তাদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের তাদের অসুবিধার কথা জানিয়ে শব্দ কমানোর অনুরোধ করা হয়। প্রথমে শব্দ কমানো হলেও পরে আবার উচ্চ শব্দেই গান বাজানো শুরু করে। এ নিয়ে বাগ্বিতণ্ডা হলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং এক পর্যায়ে পুলিশ লাঠিচার্জ করে।
এদিকে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জের প্রতিবাদে গভীর রাতে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ জেলা শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। মিছিলে ঘটনার তীব্র নিন্দা ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশে উত্থাপিত দাবিগুলো হলো– পুলিশ লাইন্সে ভবিষ্যতে উচ্চ শব্দে কিংবা অপরের কাজে ব্যাঘাত ঘটিয়ে কোনো ধরনের কনসার্ট করা যাবে না, সিসিটিভির ফুটেজ দেখে শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরি হামলাকারীদের শাস্তিসহ বরখাস্ত করা, আহতদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা
ইত্যাদি।
পরে গভীর রাতে জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসায় জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলামের উপস্থিতিতে পুলিশ সুপার শাহ আবদুর রউফ এবং মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব সাজিদুর রহমানের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের দাবি মেনে নিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস দেন পুলিশ সুপার।
জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম বলেন, বৈঠকে পুলিশ সুপার ভুল বোঝাবুঝির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। জেলা পুলিশের বরাত দিয়ে তিনি আরও জানান, ঘটনার সময় পুলিশ লাইন্সের মেইন গেটে দায়িত্ব পালনকারী তিন সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. ওবায়দুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
দারুল আরকাম মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমান এক ভিডিও বার্তায় বৈঠক সম্পর্কে বলেন, ‘আমরা খোলামনে আলোচনা করে একমত হয়েছি, ছাত্রদের পক্ষ থেকে যেসব দাবি উত্থাপন করা হয়েছে, সব দাবি ওনারা (পুলিশ) মেনে নিয়েছেন। যথাযথ বিচার পাওয়া গেছে।’
জশনে জুলুস বন্ধের দাবিতে স্মারকলিপি
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জশনে জুলুস বন্ধের দাবিতে আলেম সমাজের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। সাধারণ আলেম সমাজ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ফেসবুক পেজের একটি পোস্ট থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
পোস্টে লেখা হয়েছে, ‘অত্যন্ত আনন্দের বিষয়, জেলা প্রশাসক মহোদয় অত্যন্ত গুরুত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে আমদের স্মারকলিপি গ্রহণ করেন। স্মারকলিপি প্রদান ও যুক্তিপূর্ণ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি আমাদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটিতে এ ধরনের কোনো বিদআতি কাজ বা আয়োজন করতে দেওয়া হবে না।’
কিশোরগঞ্জে কনসার্ট বাতিল
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, কিশোরগঞ্জ শহরের পুরাতন স্টেডিয়ামে একটি কনসার্ট ইমাম উলামা পরিষদের আপত্তির মুখে প্রশাসন বাতিল করে দিয়েছে। শহরের আলিশান হোটেল নামের একটি খাবার হোটেলের উদ্যোগে গতকাল বুধবার রাত ৯টায় অ্যাসেজ ব্যান্ডের শিল্পীদের নিয়ে কনসার্টটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
অবশ্য ইমাম উলামা পরিষদের আপত্তির প্রসঙ্গ এড়িয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ইশতিয়াক ইমন বলেন, বিষয়টি আসলে এ রকম নয়। আলিশান রেস্টুরেন্ট নামে যে হোটেলের উদ্যোগে কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছিল, এটি কোনো নিবন্ধিত হোটেল নয়। যাদের কোনো নিবন্ধনই নেই, তাদের এ ধরনের কোনো কনসার্টের আয়োজনেরও সুযোগ নেই। ফলে তাদের মানা করে দেওয়া হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা ইমাম উলামা পরিষদের সভাপতি আহমাদুল্লাহ ‘শরিয়তবিরোধী গান-বাজনা’ আখ্যা দিয়ে কনসার্ট বন্ধের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে গত সোমবার লিখিত আবেদন করেন। কনসার্ট বন্ধ না হলে ঘোলাটে পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ইমাম উলামা পরিষদ নেতা আহমাদুল্লাহ জানিয়েছেন, বুধবার প্রশাসন থেকে কনসার্ট বন্ধের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। ফলে বিকেলের বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি স্থগিত করা হয়।
