১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | সকাল ১১:৫৫:০৪ মিনিট

যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ায় হামজনিত জটিলতার কারণে চতুর্থ ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এই রোগের প্রাদুর্ভাবে ইতোমধ্যেই শত শত মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন।

পেনসিলভেনিয়ার মিফ্লিন কাউন্টি করোনার অফিস জানিয়েছে, ১৮ বছর বয়সী এক তরুণ হামের বিরল ও গুরুতর স্নায়বিক জটিলতা- অ্যাকিউট এনসেফালোমাইলাইটিস -এর কারণে মারা গেছেন।

চলতি বছর ‘কিস্টোন স্টেট’-এ ছয়শো জনেরও বেশি হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার বেশিরভাগই ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টির বাসিন্দা।

টিকার সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র ২০০০ সালে হাম নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছিল। তবে চলতি বছর দেশটি ১৯৯০-এর দশকের পর থেকে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক মৃত্যুর রেকর্ড দেখলো।

গত বছর টেক্সাসে হামের প্রাদুর্ভাবে তিনজনের মৃত্যু হয়েছিল (যাদের মধ্যে দুই শিশু ছিল), যা প্রধানত মেনোনাইট সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টিকা নেওয়ার ব্যাপারে মানুষের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় টিকাদানের হার কমে গেছে, যার ফলে হাম আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে।

পেনসিলভেনিয়া রাজ্য ও স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত মাসে ১৮ বছর বয়সী এবং ৪০ বছর বয়সী যে দুজন হামজনিত জটিলতায় মারা গেছেন- তারা উভয়ই টিকাবিহীন ছিলেন।

এছাড়াও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মার্কিন শিশুরা সাধারণত ১২ মাস বয়স না হওয়া পর্যন্ত তাদের প্রথম এমএমআর (হাম, মাম্পস এবং রুবেলা) টিকা পায় না।

হামের ভাইরাস- যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো শরীরে লাল ছোপ ছোপ দাগ বা ফুসকুড়ি- টিকা আবিষ্কারের আগে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শিশুকে সংক্রমিত করত।

অত্যন্ত সংক্রামক এই ভাইরাসটি মারাত্মক হতে পারে এবং কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এনসেফালাইটিস ও স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা দেখা দিতে পারে।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, হার্ড ইমিউনিটি বা গোষ্ঠীগত প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনের জন্য প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষের টিকা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

ডেমোক্রেটিক গভর্নর জশ শাপিরো মঙ্গলবার সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ পোস্ট করে লিখেছেন, “এই রোগটি ২০০০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্মূল বলে ঘোষণা করা হয়েছিল- অথচ কয়েক দশক পরে, কম টিকাদানের হারের কারণে আমরা এর পুনরুত্থান দেখছি।”

পেনসিলভেনিয়ায় এসব মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর গভর্নর শাপিরো এবং স্বাস্থ্য সচিব রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।

শাপিরো কেনেডির বিরুদ্ধে টিকা সম্পর্কে ভুল তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছেন এবং দাবি করেছেন যে, মৃতদের পরিবারকে রক্ষা করার জন্য তিনি শীর্ষ স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কাছে মৃত্যুর বিষয়ে তথ্য গোপন রাখবেন।

অন্যদিকে, কেনেডি প্রশ্ন তুলেছেন যে, শিশু দুটির মৃত্যু আসলেই হামের কারণে হয়েছিল কি না।

গত শনিবার পেনসিলভেনিয়ার জেফারসন কাউন্টিতে ৪০ বছর বয়সী এক নারীর মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্তকারী জানিয়েছেন যে, হামজনিত কারণে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়েই তার মৃত্যু হয়েছে।

ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টির করোনার স্টিভেন ডায়ামান্টোনি জানিয়েছেন, গত ১৮ই অগাস্ট হামে আক্রান্ত হয়ে ছয় সপ্তাহ বয়সের একটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যে বিরল জিনগত রোগ ‘আমিশ লেথাল মাইক্রোসেফালি’ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিল।

ডায়ামান্টোনি আরও জানিয়েছেন যে, হামে আক্রান্ত অপর এক শিশু গত ১৪ই অগাস্ট জন্ম নেওয়ার পরপরই মারা যায়।

তার মৃত্যুর প্রাথমিক কারণ হিসেবে স্লিন ল্যাসারেইশন বা প্লীহা ফেটে যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

হামের সংক্রমণে প্লীহা বড় হতে পারে, যা প্লীহা ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। রাজ্যের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, মৃত্যুটি হাম সংক্রমণের ফলেই ঘটেছে যার ফলে প্লীহা ফেটে গিয়েছিল।

এই রাজ্যে প্রথম দুটি মৃত্যুর পর সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে- শাপিরোর বিরুদ্ধে “রাজনৈতিক ভণ্ডামির” অভিযোগ এনেছিলেন কেনেডি।

স্বাস্থ্য সচিব বলেছেন যে, পর্যালোচনা সম্পন্ন হওয়ার পরই মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র মৃত্যুর সংখ্যা সংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ করবে।

পেনসিলভেনিয়ার স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, সর্বশেষ দুটি মৃত্যুর ঘটনা আসলেই হামের কারণে ঘটেছে কি না তা নিশ্চিত করতে তারা করোনার-এর কার্যালয়গুলোর সাথে “গভীর তদন্ত” চালিয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, “এই তদন্তগুলোতে হামের সংক্রমণের ক্লিনিক্যাল প্রমাণ নিশ্চিত করা, একটি ইতিবাচক ল্যাব টেস্ট এবং মৃত্যুটি অন্য কোনো কারণে হয়নি তা যাচাই করার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।”

এদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হাম নির্মূলের মর্যাদা হারাবে কি না, এ বিষয়ে আগামী নভেম্বর মাসে একটি প্যানেল সিদ্ধান্ত নেবে, যা কানাডা গত বছরই হারিয়েছিল।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কেনেডির সমালোচনা করে যুক্তি দিয়েছেন যে তার বক্তব্য এবং মার্কিন টিকানীতির পরিবর্তন প্রাদুর্ভাব রোধের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

টিকা নিয়ে সন্দিহান কেনেডি এমএমআর টিকা সম্পর্কে মিশ্র বার্তা শেয়ার করেছেন, অথচ এই টিকাটি নিরাপদ এবং কার্যকর বলে প্রমাণিত।

স্বাস্থ্য সচিব বলেছেন যে, ক্রমবর্ধমান হামের প্রাদুর্ভাব একটি বৈশ্বিক সমস্যা।

গত মাসে সিনেট কমিটির সামনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, “অনেক দেশ তাদের হাম নির্মূলের মর্যাদা হারিয়েছে। পুরো বিশ্ব তাদের সবচেয়ে খারাপ হামের বছর পার করছে।”



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *