ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সাবেক প্রধান মোহসেন রেজাইকে নিয়োগ দিয়েছেন।

 

রেজাই এই পদে মোহাম্মাদ বাকের জোলঘাদরের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন।

রবিবার প্রকাশিত একটি আদেশে এই নিয়োগের কথা জানানো হয়। মোজতবা খামেনির নামে পরিচালিত এক্স অ্যাকাউন্টে নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, রেজাইয়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা বিবেচনা করেই তাকে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ওই পোস্টে রেজাইকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের শুরুর দিকের একজন কমান্ডার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ইরানে ১৯৮০-এর দশকের ওই যুদ্ধকে ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধ’ বলা হয়।

 

মোহসেন রেজাই আইআরজিসির সাবেক প্রধান। তিনি বর্তমানে ইরানের স্বার্থ নির্ধারণ পরিষদেরও সদস্য। ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্বার্থ নির্ধারণ পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

 

দেশটির পার্লামেন্ট ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ হলে তা মীমাংসায় এই পরিষদ কাজ করে। গার্ডিয়ান কাউন্সিল ইরানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। সরকারি বিভিন্ন পদে প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাইসহ নির্বাচনী বিষয়ে এই পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় রেজাই সামরিক কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতার কারণে ইরানের নিরাপত্তা ও সামরিক নীতিতে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

 

সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে রেজাইকে নিজের প্রতিনিধি করার পাশাপাশি মোজতবা খামেনি মোহাম্মাদ বাকের জোলঘাদরকে নিজের রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। আরেকটি আদেশে এই নিয়োগের কথা জানানো হয়। জোলঘাদরের কাজের প্রশংসা করে মোজতবা খামেনি বলেন, দায়িত্ব পালনকালে তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন। তার অভিজ্ঞতার কথা বিবেচনা করেই তাকে রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হয়েছে বলেও জানানো হয়। এর আগে জোলঘাদরই সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে মোজতবা খামেনির প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

 

জোলঘাদরের আগে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি ছিলেন আলি লারিজানি। মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তিনি নিহত হন। এরপর ওই দায়িত্বে আনা হয় জোলঘাদরকে। এখন তার জায়গায় রেজাইকে নিয়োগ দেওয়া হলো। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোয় সামরিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন গুরুত্বপূর্ণ সাবেক কমান্ডারকে আরো সামনে আনা হলো।

 

এদিকে রবিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম প্রেস টিভি জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ইসরায়েলি কয়েকটি গণমাধ্যমে মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থা ‘অত্যন্ত সংকটজনক’ বলে খবর প্রকাশের কয়েক দিন পর এই বৈঠকের খবর সামনে এলো। প্রেস টিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের প্রয়োজনীয়তা, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া সামরিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি, প্রয়োজনীয় সম্পদ নিশ্চিত করা এবং বিভিন্ন খাতে ব্যয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। অর্থনৈতিক আলোচনায় ইরানের মুদ্রা রিয়াল, বৈদেশিক মুদ্রা এবং জ্বালানি ব্যয়ের ব্যবস্থাপনার বিষয়ও ছিল। বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগ নিয়েও দুই নেতা আলোচনা করেন।

 

মাসুদ পেজেশকিয়ান ও মোজতবা খামেনির বৈঠকের কথা মোজতবা খামেনির নামে পরিচালিত ফারসি ভাষার এক্স অ্যাকাউন্টেও জানানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে পেজেশকিয়ানের দায়িত্বের তৃতীয় বছর শুরুর সময় দুই নেতা দেশের অর্থনৈতিক ও সামরিক বিষয় নিয়ে বৈঠক করেন। পোস্টে আরো বলা হয়, দেশের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল মানুষের প্রয়োজন মেটানো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের পরিস্থিতি, সামরিক অগ্রগতি, প্রয়োজনীয় সম্পদ নিশ্চিত করা এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ। রিয়াল, বৈদেশিক মুদ্রা ও জ্বালানি ব্যয় এবং বিদেশি পক্ষগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কও আলোচনা ছিল বলে পোস্টে জানানো হয়।

 

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় মোজতবা খামেনির বাবা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর মোজতবা ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি। লিখিত বিবৃতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বার্তার মাধ্যমে তিনি যোগাযোগ করছেন। তার অবস্থান ও নিরাপত্তা নিয়ে এর আগে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে বলা হয়, তার বাবার অবস্থান লক্ষ্য করে চালানো হামলার প্রথম দিকের একটি ঘটনায় মোজতবা আহত হয়েছিলেন। কিছু প্রতিবেদনে আরো দাবি করা হয়, ওই হামলার পর তার চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এরপর তিনি নিরাপত্তার কারণে আত্মগোপনে চলে যান। হামলার ঝুঁকি এড়াতে তিনি সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না করে একাধিক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে যোগাযোগ করছিলেন বলেও এসব প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

 

সম্প্রতি ইসরায়েলি গণমাধ্যমে মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থায় নতুন করে খবর প্রকাশিত হয়। সেখানে তাকে সংকটজনক অবস্থায় থাকার এবং দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার দাবি করা হয়। এর পর ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ একটি তারিখবিহীন ভিডিও প্রকাশ করে। ভিডিওতে মোজতবা খামেনিকে সুস্থ অবস্থায় দেখা যায়। মেহর নিউজই প্রথম ভিডিওটি প্রকাশ করে। সংস্থাটি ইরান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত একটি আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম। এটি ইরানের ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের অধীনে পরিচালিত হয়। মোজতবার স্বাস্থ্য ও অবস্থান নিয়ে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন খবর ও জল্পনা খণ্ডন করতেই ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *