ভরা বর্ষাতেও পানিশূন্য চলনবিল

স্টাফ রিপোর্টারঃ এক সময়ে চলনবিলের কই মাছ, বাচা মাছ, ধোদা মাছ, বড় বড় বোয়াল, শিং, টেংরা পাতাশি মাছ যারা জীবনে একবার খেয়েছে তারা কখনও ভূলতে পারবে না। চলনবিলের গ্রামের দাদা-নানাদের কাছে এসব গল্প শোনা যায়। সেসময় সৌঁতিজাল, খোরাজাল, বয়াজাল দিয়ে এসব মাছ ধরে পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দের সাথে খেত সবাই। কোথায় গেল সেইদিন আক্ষেপ করে বলেন বয়োবৃদ্ধ দাদা-নানারা।

বর্ষা মৌসুমে দেশের বৃহত্তম বিল চলনবিলসহ নিচু অঞ্চল তলিয়ে যায়। নদী-নালা, খাল-বিল থৈ থৈ করে পানিতে। তবে এবার চলনবিলে ভরা বর্ষাতেও পানি নেই। এর প্রভাব পড়েছে তিন জেলার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই বিলের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই-তিন দশক আগেও আষাঢ় মাসে চলনবিল থাকত পানিতে টইটম্বুর। এখন গোটা বিল পানিশূন্য। জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম উদাহরণ হতে চলেছে এই চলনবিল। এক সময় ধান ও মাছের প্রাচুর্য ছিল চলনবিলে। বিল ঘেঁষে থাকা শত শত দ্বীপসদৃশ গ্রাম অনেক পর্যটককে আকর্ষণ করত। বর্ষাকালে দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ তাই চলনবিলে বেড়াতে আসতেন। নৌভ্রমণের মাধ্যমে চলনবিলের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতেন তারা। সে সময় নির্মল আবহাওয়ায় স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতেন চলনবিল পাড়ের মানুষ। অথচ বর্তমানে চলনবিলে দিন দিন তাপমাত্রা বাড়ছে।

১৯৬৭ সালে প্রকাশিত ‘চলন বিলের ইতিকথা’ বইয়ে লেখক এম এ হামিদের বর্ণনা ধরে এখন চলনবিলে গেলে হতাশই হতে হয়। দখল-দূষণে মরা খালে পরিণত হয়েছে দেশের বৃহত্তম চলনবিলের নদ-নদী। পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে বিলের বিভিন্ন খাল। ভূ-উপরিস্থ পানি না থাকায় নেমে গেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। ফলে বিলুপ্ত হতে বসেছে বিলের জীববৈচিত্র ও মৎস্য সম্পদ। ব্যাহত হচ্ছে কৃষি আবাদ।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, রাজশাহী বিভাগের ৬ জেলার ১ হাজার ৮৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে ছিল চলনবিল। বর্তমানে পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ এই তিন জেলার ১০টি উপজেলার, ৬২টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৬০০ গ্রাম নিয়ে বৃহত্তর চলনবিল। বিলে রয়েছে ২১টি নদ-নদী, ৭১টি নালা-খাল ও ৯৩টি ছোট বিল।

পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, চলনবিলে ১৯৮২ সালে মাছের উৎপাদন ছিল ২৬ হাজার ৯৯০ মেট্রিক টন। এরপর ১৯৮৭ সালে ২৪ হাজার ৩৩৬ মেট্রিক টন, ১৯৯২ সালে ১৮ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন, ১৯৯৭ সালে ১৫ হাজার ৪২১ মেট্রিক টন, ২০০২ সালে ১২ হাজার ৪৬০ মেট্রিক টন এবং ২০০৬ সালে উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ১১৭ মেট্রিক টন। এই হিসাবে ২৫ বছরে চলনবিলে মাছের উৎপাদন কমেছে ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ। গড় উৎপাদন কমেছে ১২ দশমিক ১ শতাংশ। প্রতিবছর উৎপাদন কমেছে ৩ শতাংশ।

চলনবিলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আঁকাবাঁকা রাস্তায় ছেয়ে আছে পুরো বিল। মাঝেমধ্যেই ছোট-বড় ব্রিজ। বর্ষা মৌসুমে চলনবিলে যে পরিমাণ পানি থাকার কথা, বর্তমানে তা নেই।

বিল এলাকার বাসিন্দারা বলেন, চলনবিলে একসময় সারা বছর পানি থাকত। উঁচু জমিতে ফসল আবাদ, নদী-খালে মাছ শিকার চলত। অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণেই বৃহৎ এই বিল এখন পানিশূন্য। এতে একদিকে মৎস্য সম্পদ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি আবাদ। চলনবিল থেকে ধরা ছোট মাছ থেকে তৈরি করা হয় শুঁটকি। তবে দিন দিন মাছ কমে যাওয়ায় আগের মত আর বসে না শুঁটকির চাতাল। চলনবিল থেকে ধরা ছোট মাছ থেকে তৈরি করা হয় শুঁটকি। তবে দিন দিন মাছ কমে যাওয়ায় আগের মত আর বসে না শুঁটকির চাতাল।

চলতি বর্ষা মৌসুমে পানিশূন্যতায় ধুঁকছে দেশের বৃহত্তম বিল খ্যাত চলনবিলের জলাশয়গুলো। নেই তেমন বৃষ্টি। বিলে নেই মাছ। তাই অলস সময় পার করছেন এ অঞ্চলের জেলেরা। অনাহারে অর্ধাহারে কাটছে তাদের জীবন। শুকনো মৌসুমে অন্যের জমিতে কাজ করে সংসার চলে জেলেদের। আর বর্ষায় শুরু হয় তাদের মাছ ধরার কাজ। কিন্তু এবার বর্ষায় বিলে পানি না আসায় তারা হতাশ। কারণ মাছ বিক্রি করেই ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়াসহ সংসারের যাবতীয় খরচ যোগাতে হয় তাদের।

এক সময় বর্ষা এলেই চলনবিলের জেলেরা বিভিন্ন সরঞ্জাম দিয়ে মাছ ধরায় মেতে থাকতেন। মিলতো নানা জাতের ছোটবড় মাছ। সেই মাছ স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে দেশ-বিদেশে রপ্তানি হতো। জেলেদের পরিবার-পরিজন নিয়ে স্বচ্ছলভাবে দিন কাটতো। কিন্তু এবারের বর্ষা যেন বৈরী। ফলে তাদের মুখে নেই হাসি। মহাসংকটে চলছে তাদের সংসার। নেই কোনো সরকারি-বেসরকারি অনুদানও।

সিংড়া পৌর এলাকার চকসিংড়া ও শোলাকুড়া গ্রামের মৎস্যজীবি আব্দুল্লাহ, শাহাদত হোসেন, করিম মৃধা বলেন, মাছ ধরেই চলে আমাদের জীবন জীবিকা। তাই বর্ষা শুরুর আগেই মাছ ধরার জন্য খেয়া জাল, জাকই জাল, ধুন্দি, চাঁই, পলোসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরি করে রেখেছি। অথচ বর্ষা মৌসুমেও বিলে পানি আসেনি। শালমারা গ্রামের মৎস্যজীবি মাহাবুর শেখ বলেন, ভরা বর্ষায় বিলে পানি না থাকায় আমাদের উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

পরিবেশ ও প্রকৃতি আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর সিদ্দিকী বলেন, দাদা-দাদীসহ গ্রামের বয়োবৃদ্ধদের কাছে চলনবিলের অনেক গল্প শুনেছি। এগুলো এখন শুধুই ইতিহাস। অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও অবৈধ দখলে চলনবিল এখন বর্ষা মৌসুমেও পানিশূন্য। চলনবিল দখলমুক্ত করতে প্রশাসনের নজর দেয়া উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published.